কী ভয়ংকর প্রার্থনা : বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কা বানিয়ে দাও

বার্তাজগৎ২৪/ এমএ
বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক : বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক :
প্রকাশিত: ৫:৩৩ পূর্বাহ্ন, ২৪ এপ্রিল ২০২২ | আপডেট: ৫:৩৩ পূর্বাহ্ন, ২৪ এপ্রিল ২০২২

চারপাশে আলোচনা সমালোচনা শুনে শুনে মনে হয়, "হায় আফসোস, বাংলাদেশ এখনো কেন শ্রীলংকার মতো অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয় না?" তাদের কথায়-বার্তায় মনে হয় দেশটা যদি শ্রীলঙ্কার মতো ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়তো, যদি শ্রীলঙ্কার মতো ১৪ ঘন্টা বিদুৎ না থাকতো, যদি বিদ্যুতেও রেশনিং চালু হতো, যদি খাদ্যের অভাব পড়তো, চারদিকে হাহাকার উঠতো তাহলেই তারা আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে আনন্দের সাথে বলতো এইবার আর রক্ষা নেই, শেখ হাসিনা একটা বড় বেকায়দায় পড়েছে !

দেশের গরীব দুখি মানুষ বিদ্যুৎ না পেয়ে, খাদ্য না পেয়ে কষ্ট করলে তাদের সুখ, সরকার এইবার খাদে পড়েছে। এমন রুচির মানুষের অভাব নেই এদেশে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি আর শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি এক নয়। বাংলাদেশের নেতা আর শ্রীলঙ্কার নেতা এক নয়।

আরও পড়ুন : নাইজেরিয়ায় তেল শোধনাগারে বিস্ফোরণ, নিহত শতাধিক

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকশে,
প্রধানমন্ত্রী হলেন বড় ভাই মাহিন্দ রাজাপাকশে, অর্থমন্ত্রী তার আরেক ভাই বাসিল রাজাপাকশে। যিনি স্ব-ঘোষিত মিস্টার টেন পার্সেন্ট। সেচ মন্ত্রী তাদের আরেক ভাই চমল রাজাপাকশে। মাহিন্দা রাজাপকশের এক ছেলে নমল রাজাপাকশে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী, ২য় ছেলে ইয়োশিথা রাজাপাকশে চীফ অব আর্মি স্টাফ, সেচ মন্ত্রীর ছেলে শশীন্দ্র রাজাপাকশে হলেন কৃষি মন্ত্রী, তার আরেক ছেলে শমিন্দ্র রাজাপাকশে এয়ারলাইনসের ডাইরেক্টর। পরিবারের আরো ক'জন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্বে আছেন। বলা হয়, শ্রীলঙ্কার জাতীয় বাজেটের ৭৫% ভাগ তাদের পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। এমন অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবারের একক ডিক্টেটরশিপ পৃথিবীতে সামন্তযুগেও ছিলো না।
শ্রীলংকার এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য বিভিন্ন কার্যকারণের কথা অনেকেই বলছেন। তবে বিপর্যয়ের সবচে বড় কারণ হলো নেতৃত্বের চরম অপরিপক্কতা, অদূরদর্শিতা ও কমিশন খাওয়ার দুর্বলতা। এটিই প্রধান কারণ।

চীন একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসাবে পরিচিত হলেও আজকের চীন সারা দুনিয়ায় লগ্নিদাতা মহাজনি দেশ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। মাও সেতুং এর চীন আর দেং জিয়াও পিং কিংবা আজকের শী জিন পিং এর চীন এক নয়। মাও সে তুং এর পরে চীন তার অর্থনৈতিক নীতিতে পরিবর্তন এনেছে। চীন এখন আর মার্কসবাদী লেনিনবাদী ধারায় এমনকি মাওবাদী ধারায়ও নেই। সেও এখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অনেক মৌলিক চরিত্র ধারণ করেছে। সেও এখন মহাজনি কারবারে লিপ্ত হয়েছে। সেও আরেক সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র নিয়ে দেশে দেশে ঢুকছে।

শ্রীলঙ্কার এ চরম দূরবস্থার কারণ :

১ নম্বর কারণ: শ্রীলঙ্কার অদূরদর্শী নেতৃত্ব, দাতাদেশ চীন ও বিভিন্ন দাতা সংস্থার শর্তের জালে এই নেতৃত্ব পা দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে।

২ নম্বর কারণ : ব্যাপক পরিমাণ ৯৭ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ। এই ঋণ পরিশোধ করতে প্রতি বছর ৭ বিলিয়ন ডলার দিতে হবে, যা শ্রীলঙ্কার পক্ষে অসম্ভব। হাতে রিজার্ভ মাত্র দেড় বিলিয়ন। শ্রীলঙ্কা ঋণের এমন জালে আটকা পড়েছে যে আমাদের গ্রামের মহিলা সমিতির
কুলসুম আক্তারের মত। গ্রামীণ ব্যাংক, ব্রাক, পপি সমিতির ঋণ নিয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ করে। এক ঋণ শোধ করতে গিয়ে আরেক ঋণ। বছর শেষে কিস্তি জমতে জমতে পাহাড় হয়ে যায়।  অতঃপর কুলসুম হয় ভিটাহারা। শ্রীলংকার দশা হয়েছে এমন। সে চীনের ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে তার হামবানটোটা সমুদ্র বন্দরের মালিকানা  ৯৯ বছরের জন্য লীজ দিয়ে ফেলেছে। শ্রীলঙ্কার রিজার্ভ এখন মাত্র ১.৬ বিলিয়ন ডলার। কোত্থেকে সে ঋণ পরিশোধ করবে? বর্তমানে চীনের এক্সিম ব্যাংকের নাম শুনলে লাওস ভয়ে কেঁপে ওঠে। নাইজেরিয়া একটি দেশ যারা আইএমএফ ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের জালে আটকে গেছে। আফ্রিকার কিছু দেশ, এমনকি ইউরোপের কিছু দেশ চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণ নিয়ে ধরা খেয়েছে।
শেখ হাসিনার কাছে এই সমস্ত সংবাদ আছে। তাই ঋণ নিতে শেখ হাসিনার সরকার হিসাবি। বাংলাদেশ যে ঋণ নিয়েছে তার ইন্টারেস্ট মাত্র ১.৪% । অনেক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড আছে ১০ বছর। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এখনও মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। তার স্ট্রং রিজার্ভ প্রায় ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যেখানে পাকিস্তানের রিজার্ভ মাত্র ২৩.৮ বিলিয়ন ডলার।

আমাদের জাতীয় ঋণ ৩৪.৮১% যেখানে ভারত ৬৯% পাকিস্তান ৭৭% শ্রীলঙ্কা ৮৩%।
ভয় বাংলাদেশের নেই। আওয়ামী-বিরোধী
প্রতিপক্ষ বারবার শ্রীলঙ্কার উদাহরণ দিচ্ছে। বোঝা যায় তারা দেশটাকে কত ভালোবাসে?
তারা দোয়া করে, কামনা করে বাংলাদেশ এমন গভীর সংকটে পড়ুক। তাহলে তাদের রাজনৈতিক ফায়দা হবে। শেখ হাসিনা তার সততা যোগ্যতা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তাকে সরানোর জন্য কী ভয়াবহ প্রার্থনা?

শ্রীলংকার অর্থনীতি পতনের ৩ নম্বর কারণ: শ্রীলংকার প্রধান আয়ের উৎস পর্যটনশিল্পে গেলো ২ বছরে ব্যাপক ধ্বস। পর্যটন খাতের উন্নয়নে বিমানবন্দর নির্মাণে ঋণ নিয়ে ঋণদাতার শর্তে  ভুল স্থানে নির্মিত হয়েছ বিমানবন্দর। ২ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার দেশ শুধু বিদেশি পর্যটক কাস্টমারের আশায় বসে থেকে সেখানে যথেষ্ট পরিমাণে যাত্রী না পাওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়েছে এই 'মাত্তালা রাজাপাকশে বিমানবন্দর'। যার ফিটব্যাক নেই, রিটার্ন আসার সম্ভাবনা নেই। কিছুদিন পরে এই বিমানবন্দরটিও লীজ দিতে হবে। রেললাইন, দৃষ্টি নন্দন ঝুলন্ত ব্রিজ নির্মাণ, পাহাড় জঙ্গল ডিঙিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, গভীর সমুদ্র বন্দর, সমুদ্রে বালু উত্তোলন করে কৃত্রিম সিটি তৈরির অপরিকল্পিত বিলাসী প্রকল্প গ্রহণই কাল হয়েছে শ্রীলঙ্কার। এগুলোও ইকোনমিকেলি ভায়েবল নয়। বিশাল শ্বেতহস্তী পালনের জন্য উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছে দেশটি।

৪ নম্বর কারণ: বিদেশে থাকা কর্মী যারা রেমিটেন্স যোদ্ধা, তাদের একটি বড় অংশকে দেশের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে কাজ লাগানোর কথা বলে দেশে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে নিজের অর্থনীতির গোড়ায় কুঠার চালানো হয়। এমন অপরিপক্ক সিদ্ধান্তের ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস পায়।

৫ নম্বর কারণ : সুদূরপ্রসারী চিন্তা না করে তথাকথিত পরিবেশ বান্ধব জৈব কৃষির কথা বলে কেমিক্যাল ফার্টিলাইজার ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেয়। কৃষি উৎপাদনে ধ্বস নামে। শুধু চা, চাল, রাবার উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল দেশটির কৃষির উপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

৬ নম্বর কারণ : এক পরিবারের উচ্চমাত্রার দূর্নীতি। ঋণদানকারী সংস্থার সাথে কমিশন ভাগাভাগি এবং অন্যান্য খাতে গোষ্ঠীতন্ত্রের ব্যাপক দূর্নীতি দেশটাকে নাজেহাল করেছে।

৭ নম্বর কারণ: আমদানি রপ্তানির বিশাল ফারাক। গার্মেন্টস রপ্তানি, চা রপ্তানি অনেক কমে গেছে, আমদানি অনেক বেড়ে গেছে। এরূপ আমদানি নির্ভরতার কারণে রিজার্ভ ফান্ডের উপর অসহনীয় চাপে ন্যুব্জ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ সুদূর পরাহত। তবে যদি আবার পর্যটকদের সমাগম বৃদ্ধি পায় এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে তাহলে শ্রীলঙ্কা হয়তোবা দাঁড়াতে পারে, তবু এক যুগ সময়েও পারবে কিনা সন্দেহ আছে। আর বাংলাদেশের জন্য যারা বিপর্যয় কামনা করছেন তাদের হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

কারণ : এক. বাংলাদেশের নেতা দূরদর্শী। সুদূরপ্রসারী ভিশন নির্ধারণ করে এগুচ্ছেন। মেগা প্রকল্পগুলো ইকোনমিকেলি ভায়াবল। পদ্মা সেতু(ঋণ ছাড়া), মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, দোহাজারি-কক্সবাজার রেল, বঙ্গবন্ধু কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রত্যেকটা ইকোনমিক রিটার্ন দেবে। বাংলাদেশের নেতা হিসাব করে ইনভেস্ট করছেন।
তিন. বাংলাদেশের নেতা তার অনেক আত্মীয় পরিজনকে ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দু থেকে দূরে রেখেছেন। সম্প্রতি কাউকে সরিয়েও দিয়েছেন।

দুই. বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দুশ্চিন্তার মতো এতো বেশি নয়। ৩৫ হাজার কোটি  টাকা। যেখানে পার্শ্ববর্তী সবগুলো দেশে এরচেয়ে অনেক বেশি (উপরে উল্লেখ আছে)।

তিন. উচ্চাভিলাষী, বিলাসী, অনুৎপাদনশীল
কোনো মেগা কিংবা মাঝারী প্রকল্প নেওয়া হয়নি। যেখান থেকে দেশ রাজস্ব আয় পাবে না।

চার. কেবল আইএমএফ এবং চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন (?) সহযোগী নয়। আছে রাশিয়া, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আছে এডিবি, আইডিবি, মালয়েশিয়া এবং সতর্কতার সাথে নিয়েছেন বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, চীনকে।

পাঁচ. বাংলাদেশে আছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, যা আশেপাশে নেই। আছে সরকারের ধারাবাহিকতা, উন্নয়নের জন্য যা খুব প্রয়োজন। স্থিতিশীলতার ফলে ইউরোপ আমেরিকার গার্মেন্টস বায়াররা পাকিস্তান শ্রীলংকা নেপাল থেকে মুখ ঘুরিয়ে বাংলাদেশমুখি হয়েছে। ফলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি পাবে।

লেখাটি আর বড় না করে শুধু এটুকু বলেই শেষ করছি, যারা সমালোচনা করছেন তারা দেশটাকে খাদে দখতে চান। তাদের আশায় ছাই। দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

শরীফ সাদী
অধ্যক্ষ, পৌঢ় মহিলা কলেজ, কিশোরগঞ্জ।

বার্তাজগৎ২৪/ এমএ