কেমন ছিলো শোভন-রাব্বানীর এক বছর

মোল্যা আনিসুর রহমান (আনিস)

প্রকাশিতঃ ৩১ জুলাই ২০১৯ সময়ঃ রাত ৯ঃ০৪
কেমন ছিলো শোভন-রাব্বানীর এক বছর
কেমন ছিলো শোভন-রাব্বানীর এক বছর

 

মোল্যা আনিসুর রহমান (আনিস):

রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক বছর পূর্তি হলো আজ (৩১ জুলাই) বুধবার। 

গত বছর ২০১৮ সালের মে মাসের ১১ ও ১২ তারিখে ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় অধিবেশনের পর কমিটি ঘোষণার নিয়ম থাকলেও শীর্ষ পদের নেতৃত্ব বাছাইয়ে সময় নেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ৩২৩ জনের জীবনবৃত্তান্ত বিভিন্ন মাধ্যমে যাচাই-বাছাইয়ের পর এসব পদপ্রত্যাশীদের গণভবনে ডাকেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

এরপর ৩১ জুলাই সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণের কমিটি ঘোষণা করা হয়। 

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গোলাম রাব্বানীর নাম ঘোষণা করা হয়। 

শোভন-রাব্বানী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তাদের চলার পথ এতোটা সহজ ছিলো না। ছাত্রলীগের কথিত অদৃশ্য সিন্ডিকেট তাদেরকে চাপে রাখার চেষ্টা করেছিলো। এমনকি একটি সূত্রে জানা যায়, পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করতে দেরি হওয়ারও নাকি অন্যতম কারণ ছিলো এই সিন্ডিকেটের কালো হাত। 

শোভন-রাব্বানী পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে প্রায় নয় মাস সময় নিয়েছিলেন। এই দীর্ঘ সময় ধরেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা নিয়ে মতবিরোধ চলছিল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের সঙ্গে বর্তমান সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর।

একটি সূত্র বলে, শোভন-রাব্বানী দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে ব্যর্থ হচ্ছিল বলে কমিটি গঠনের দায়িত্বভার পরে সাবেক দুই নেতা সোহাগ ও জাকিরের উপর। এতে অনেকটাই বেকায়দায় পড়েন ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। গণভবন সূত্রে জানা যায়, পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে দু’বার ফেরত এসেছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। তাদের জমা দেয়া কমিটির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকা তালিকার ব্যাপক অমিল থাকার কারণেই নাকি তাদের ফেরত আসতে হয়েছিলো। 

অবশ্য কমিটি করতে বিলম্ব হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ছাত্রলীগের সাবেক দুই নেতা সোহাগ- জাকিরের অসহযোগিতাকেই দায়ি করেছিলেন শোভন-রাব্বানী। 

অবশেষে সব নাটকের সমাধান করে চলতি বছর ১৩ মে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। 

পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হওয়ার পর কমিটিতে অনেক বিতর্কিতদের স্থান দেওয়ার অভিযোগ তোলে ছাত্রলীগ থেকে বাদ পড়া পরিশ্রমী নেতা কর্মীরা। পদবঞ্চিতদের অনেকেই সোহাগ-জাকির কমিটিতে পদে ছিলো কিন্তু শোভন-রাব্বানীর পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তাদের বয়স থাকার পরও স্থান না দেওয়ার অভিযোগ উঠে। এই পদবঞ্চিতরা ছাত্রলীগ থেকে বিতর্কিতদের বাদ দেওয়ার দাবি তোলে। অবশেষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ১৯ জন বিতর্কিত পদধারীর পদ শূন্য ঘোষণা করে। 

অবশ্য এই ১৯ জনের পদ শূন্য ঘোষণা করা নিয়েও শুরু হয় নতুন বিতর্ক। কারণ ১৯ জনের পদ শূন্য ঘোষণা করা হলেও সেই ১৯ জন কারা তাদের নাম ঘোষণা করা হয়নি। এ বিষয়ে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী কয়েকবার এই ১৯ জনের নাম ঘোষণা করার কথা বলেও নাম ঘোষণা করেনি। 

এ বিষয়ে পদবঞ্চিতদের অভিযোগ, ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ঐ বিতর্কিতদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়েছেন বলেই তাদের নাম ঘোষণা করছে না। 

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির এক বছর পূর্তি উপলক্ষে কেমন ছিল গত এক বছরে নেতৃত্ব ও তাদের সাফল্য-ব্যর্থতা। এ নিয়ে চলছে তৃণমূলের নেতার্মীদের বিশ্লেষণ। 

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক আহসান হাবিব বার্তা জগৎ২৪ কে জানান, ইতিমধ্যে ২ টি সাংগঠনিক ইউনিটের নতুন কমিটি দেওয়া হয়েছে। ইউনিট দুটো হচ্ছে- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়। তাছাড়া ৪ টি সাংগঠনিক ইউনিটের সম্মেলন শেষ হয়েছে। আরও ৮ সাংগঠনিক ইউনিটের সম্মেলনের তারিখ ঘোষিত হয়েছে। 

এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র দুটি সাংগঠনিক ইউনিটের নতুন কমিটি ঘোষণা হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, শোভন-রাব্বানী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দায়িত্ব পাওয়ার পর সারাদেশে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, জাতীয় নির্বাচন সহ ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অনেক ব্যস্ত সময় পর করেছে। যার কারণে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর নতুন কমিটি করতে বিলম্ব হয়েছে। 

ডিসেম্বরের মধ্যেই অধিকাংশ সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর সম্মেলনসহ নতুন কমিটি হবে বলে তিনি জানান। 

গত এক বছরে শোভন-রাব্বানীর কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পূর্বের তুলনায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নেতিবাচক কাজের জন্য পত্রিকার শিরনাম কম হয়েছে। সারাদেশে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের টেন্ডার বাণিজ্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে বর্তমান কমিটি। কারণ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ঘোষণা দিয়েছিলেন, নিয়মিত ছাত্রদের দিয়েই ছাত্রলীগ চলবে। ছাত্রলীগের কোন নেতা টেন্ডার বাণিজ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকবে না। কারো বিরুদ্ধে এমন কোন অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি বলেছিলেন। 

ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, শোভন-রাব্বানী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৩তম শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষে মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়। শোক দিবসের আলোচনা সভা ও বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে নানা প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয় শোকাবহ আগস্ট। এছাড়াও ২১ আগস্ট গ্রেনেট হামলা দিবস, শেখ হাসিনার জন্মদিন উদযাপন, জেলহত্যা দিবস, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, বিজয় দিবস, ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস, জাতীয় শহীদ দিবস, ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ, বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকীসহ অন্যান্য কর্মসূচি পালন করে।

ডাকসু নির্বাচনে শুধু ভিপি বাদে প্রায় সব পদেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্যানেল বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়। এই বিজয় ছাত্রলীগের সম্মিলিত শ্রমেই এসেছে বলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মনে করে। অবশ্য বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের ভিপি পদে পরাজয়কে অনেকে ভিন্নভাবে দেখেছেন। ছাত্রলীগের একটা মহল ষড়যন্ত্র করে শোভনকে পরাজিত করেছে বলেও তখন কথা ওঠেছিলো। কিন্তু বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন সভাপতি হিসেবে যে দায়িত্ব থাকে শোভন সেই দায়িত্বের জায়গা থেকেই সেদিন পরাজয়কে মেনে নিয়ে বিজয়ী ভিপি নুরকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।

এছাড়াও সারাদেশে বন্য কবলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের বন্যা কবলিত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। 

এবার মৌসুমে ধানের দাম কম থাকায় সারাদেশের কৃষকরা টাকার অভাবে ধান কাটতে পারছিলো না। এমসয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সারাদেশের কৃষকের পাশে দাড়ায়। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক নিজে গিয়েও কৃষকের ধান কেটে বাড়ি পৌছে দিয়েছেন। অবশ্য ঐ সময় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর নতুন দামী লুঙ্গি, হাতে দামী ব্যান্ডের ঘড়ি ও মাথায় নতুন গামছায় কৃষক সেজে ফটোশেসন করার সমালোচনাও হয়েছিলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। 

সম্প্রতি ঢাকা শহরে ডেঙ্গু মশার প্রকোপ বেড়ে গেছে। কয়েক হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে৷ এরমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রের মৃত্যু ঘটেছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এই ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে ডেঙ্গু সচেতনতা মূলক বিভিন্ন প্রকার লিফলেট বিতরণ সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক ভবনের আশেপাশে ফগার মেশিন দিয়ে ডেঙ্গু নিধন ঔষুধ ছিটিয়েছেন। 

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বিগত এক বছরের সফলতা এবং আগামীতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পরিকল্পনা ও কর্মসূচির বিষয়ে জানার জন্য বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে ফোন করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন রেখে দেন। 

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতাও কম নয়৷ সারাদেশে যে সব কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি গুলো ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ করার ঘোষণা দিয়েও সব কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি। পূর্নাঙ্গ কমিটিতে বাদ পড়া পদবঞ্চিত যখন মধুর ক্যান্টিনে  সংবাদ সম্মেলন করছিলো তখন তাদের উপর ছাত্রলীগের হামলা এবং গবীর রাতে পদবঞ্চিত উপর টিএসসিতে হামলার ঘটনাও মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে। সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে ২ দুই ঘন্টা দেরি করে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক সম্মেলন স্থলে পৌঁছান। যেখানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রায় দুই ঘন্টা অপেক্ষা করেন ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের জন্য। এদিকে সম্মেলনের জন্য সকাল থেকে অপেক্ষা করতে থাকা এক ছাত্রলীগ কর্মীর প্রচণ্ড রোদে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু ঘটে। অবশ্য ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক তাদের দেরির কারণ হিসেবে সাধারণ সম্পাদকের মায়ের মৃত্যু বার্ষিকীর অনুষ্ঠান থেকে ফিরতে দেরি হওয়াকে বুঝিয়েছেন।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এর নিন্দা করেছেন। অনেকে এটাকে ছাত্রলীগ সূলভ আচরণ নয় বলেও জানিয়েছেন। 

বার্তা জগৎ২৪/ এম এ