পুলিশের সাফল্য কেন অন্য বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ঈর্ষণীয়?

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ৫ অগাস্ট ২০২০ সময়ঃ দুপুর ১ঃ১৮
পুলিশের সাফল্য কেন অন্য বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ঈর্ষণীয়?
পুলিশের সাফল্য কেন অন্য বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ঈর্ষণীয়?

ফেসবুকের পাতা থেকে:


বিয়ে না করেই শ্বশুর বাড়ি! প্রকাশ্যে আমাদের দেশে এখনো এমনটা ঘটে না। যা হয় গোপনে। সেটা ঘটে ভালোলাগা, ভালোবাসা, বিশ্বাস আর নির্ভরতা নিয়ে। তেমনি একটা ঘটনা ঘটেছিল জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে। কেউ কি জানতো সেটা! জানতো না ঘটনার ভিকটিম ‘রুমা’ও। তাইতো মাঝরাতে প্রেমিকের হাতে হাত রেখে পুলকিত ছিল তার যাত্রা। কিন্তু গোল বাধলো মাঝপথে। প্রেমিকের বন্ধুরা টেনে-হিঁচড়ে তাকে নিয়ে যাচ্ছে আখ ক্ষেতে। মুখে প্রেমিকের হাত। চিৎকার করার সুযোগ নেই রুমার। এটা দৃষ্টি এড়ায়নি ভ্যান চালক মান্নানের। সেল ফোনটা মুখে নিয়ে সোজা জানিয়ে দেয় এসপিকে। মাঝরাতে পুলিশ ছিল টহলে। মাত্র তিন মিনিটের মাথায় ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা পায় রুমা।

সেই রাতের আধারের চেয়ে বেশি আঁধারে ছিল রুমা নিজেই। যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছে ক্ষতিটা করেছে সে-ই। কোনো আত্মীয়, বন্ধু, এমনকি পরিচিত জনও এগিয়ে আসেনি সেই রাতে। মাঝরাতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে তারা। অজানা, অচেনা পুলিশই হয়েছিল আপনজন; বিপদের বন্ধু। বিপদগ্রস্ত মানুষের কাছে এরকম পুলিশি সেবা চিরায়ত। হোক গ্রীষ্মের দাবদাহ, বর্ষার অবিরাম ধারা অথবা হাড় কাঁপানো শীতের প্রকোপ। মানুষের আরামের ঘুম নিশ্চিত করে কে? সেটা পুলিশই। বিপদটা মধ্যরাতে হোক, রাস্তা-ঘাট, বাড়িতে,

গাড়িতে যেখানেই হোক। একটু সংবাদেই ছুটে যায় পুলিশ। ঠিক আপনজন যেভাবে ছুটে যায়; তেমনিভাবে মানুষকে বিপদমুক্ত করে। 

পুলিশি সেবা না হলে প্রতিদিন বাড়ি-ঘর, জমি-জমা, সম্পদ দখল, ফসল কাটা প্রভৃতি নানা ইস্যু নিয়ে কত রক্তক্ষয়, প্রাণহানি হতো; কত মানুষের বাড়িতে চুরি-ডাকাতি হতো-সেটা অভাবনীয়। পুলিশের কারণে কত মানুষ নিরাপদে থাকে, কত মানুষ বিপদগ্রস্ত হয় না; কোনো পরিসংখ্যানে এই সেবা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। যেভাবে দেখানো হয় পরীক্ষার ফল, রাস্তা-ঘাট, কালভার্ট নির্মাণ অথবা নিরক্ষরতা দূরীকরণ অভিযানের ফলাফল- সেভাবে পুলিশের সাফল্য দেখানো যায় না।


পুলিশকে মূল্যায়নের পথটাই বরং উল্টো। কতটা চুরি হয়েছে, কতটা ডাকাতি বা খুন হলো এই নেতিবাচক চিত্রটাই পুলিশের কর্মতৎপরতা মাপবার মাপকাঠি। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কেউ মাদক খাবে- সেজন্য দায়ী পুলিশ। মেহেদীর রং না মুছতেই রক্তে রঞ্জিত গৃহবধূর মৃত্যুর জন্য জবাবদিহিতাও পুলিশের। ভালোবেসে জাতকুল ত্যাগী মৃত্যুঞ্জয়ের লাশের পাশে থাকতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে শরৎচন্দ্রের গল্পের নায়িকা ‘বিলাসী’। কিন্তু সেটা উপেক্ষা করতে পারে না এক অনাহুত অতিথি। নাম তার পুলিশ। দুর্গন্ধটা এড়াতে নাক বন্ধ করে। বুকে চেপে ধরে অচেনা মানুষের লাশ। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে হয়তো এ দৃশ্য আসে না। তাই সহজেই লেখা যায় ‘থানা পুলিশে বিশ্বাস নেই’। নিজের ওপর দায়িত্ব না নিয়ে মানুষের কথা বলে চালিয়ে দেয়াও যায়। মানুষের ওপর দোষ চাপাতে অসুবিধা কোথায়?

অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই প্রত্যেক সমাজে, প্রত্যেক পেশায় অনেক ভালো মানুষ আছে। আছে কিছু মন্দ মানুষও। যেমন- জেমস গর্ডন বেনেট, রান্ডল্ফ হাস্ট, এমনকি যোশেফ পুলিৎজারের সেনশেসনালিজম, হলুদ সাংবাদিকতাকে সৎ পেশাদার সাংবাদিকগণ মেনে নিতে পারেননি। সেটা বর্তমান যুগেও চলমান। পছন্দ না হলেও তাদেরকে পেশা থেকে ছেঁটে ফেলতে পারেন না সত্যনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল সাংবাদিকগণ। তাদেরও আছে পেশাগত এবং আইগত সীমাবদ্ধতা। তেমনিভাবে অসৎ, অসংবেদনশীল, রূঢ় পুলিশ সদস্যকেও মানতে পারেন না সৎ, মননশীল পুলিশ সদস্যগণ। তাদের অপেশাদারিত্ব, অপরাধকে সমর্থন বা প্রশ্রয় দেয় না পুলিশ বিভাগ। সমস্যাটা হলো এই যে, পুলিশের কর্মক্ষেত্র ও আবাসস্থলের পরিধি বিস্তীর্ণ এবং অনিয়ন্ত্রিত। 

তাই অন্য যে কোনো পেশার চেয়ে একজন পুলিশ সদস্যের অপরাধে জড়ানোর ক্ষেত্রটা প্রশস্ত। ঠিক তেমনি বিস্তৃত শাস্তির খড়গও। অনিয়মতান্ত্রিক পোশাক পরা, কারো সাথে অসদাচরণ করা অর্থাৎ বিচ্যুতি করা থেকে শুরু করে ফৌজদারি অপরাধ- কোনোটাই এড়িয়ে যেতে পারে না কেউ। তাই তিরস্কার থেকে শুরু হয় শাস্তিটা। ফৌজদারি অপরাধে জড়ালে তাকে তো পুলিশ হিসেবে গণ্যই করা হয় না। গ্রেফতার করে সোজা পাঠানো হয় জেলহাজতে। অন্য দশটা অপরাধীর মতই গণ্য করা হয় তাকে।

এই জবাবদিহিতার পরিধিটাও ব্যাপক। একজন পুলিশ সদস্য তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দায়বদ্ধ। দায়বদ্ধ আদালতের কাছে। স্বাধীন গণমাধ্যমের উপজীব্য হিসেবে ‘অপরাধ’ বড়ই পছন্দ। আইন প্রয়োগকারীর অপরাধে জড়ানো তো সংবাদ হিসেবে ‘হটকেক’। পুলিশি জবাবদিহিতা আছে গণমাধ্যমের কাছেও। আছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে দায়বদ্ধতা। সংসদীয় কমিটিও ছেড়ে দেয় না। বিভিন্ন এনজিও, মানবাধিকার কমিশন তো সমালোচনামুখর। এতগুলো জবাবদিহিতা আর ক’টা পেশার মানুষের আছে? তাইতো পান থেকে চুন খসলে যেমন শাস্তি হয়, তেমনি শাস্তি হয় পুলিশ সদস্যের। হোক সেটা সাধারণ বিচ্যুতির, অথবা ফৌজদারি অপরাধের।

প্রশ্ন আসে একজন পুলিশ তো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করবে। সে অপরাধে জড়াবে কেন? এ প্রশ্নের জবাবটা খোঁজা জরুরি। 

স্বর্গসুখে থেকেও মানুষ কেন অপরাধ করেছিল? কেন স্বর্গচ্যুতির শাস্তিটা পেয়েছিল? সেটা সবাই কমবেশি জানেন। ধর্মীয় এবং সনাতনী প্রতিষ্ঠিত ধারণা যে, মানুষের ওপর শয়তানের প্রভাব আছে। সিগমন্ড ফ্রয়েডের ‘ইড’ এবং ‘আনন্দফুর্তির নীতি’ (Pleasure Principle), লম্ব্রোসোর ‘নৃতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা’ বা জেনেটিক প্রভাবের বিষয়টিও নতুন নয়। ‘ইউখেলশন’ এবং সামনাও’ এর মত পন্ডিত অপরাধে জড়ানোর জন্য পারিপার্শ্বিক প্রভাবকে গুরুত্ব দিয়েছেন। যেমনিভাবে ‘সি এন ট্রুম্যান’ নৈতিক শিক্ষার অভাবকে সামনে নিয়ে এসেছেন।

স্নেহ-মায়া-মমতা-ভালবাসার অভাবটাও তার দৃষ্টি এড়ায়নি। পৃথিবীর তাবৎ মানুষ এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রহণ করেছে এই পন্ডিতগণের ধারণা। ব্যতিক্রম শুধু এদেশে। স্পষ্ট করে বললে শুধু পুলিশের বেলায়। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে, জাল সার্টিফিকেট নিয়ে ধরা পড়েছেন বাঘা বাঘা আমলা, হাজার হাজার কোটি টাকার নানা প্রকল্প কাগুজে ফলাফলে শেষ হচ্ছে। বাজার অর্থনীতির তোড়ে ভেসে যাচ্ছে মূল্যবোধ। সামাজিক মিডিয়ায় শরীর বিক্রির বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে পড়ছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়ের স্রোতে ভেসে যাবে সমাজ। অনড় থাকবে শুধু পুলিশ। যেন স্বর্গপুর থেকে আসা দেবদূত তারা। তাদের কেউ আর দশটা পেশার মানুষের মত অপরাধ করবে কেন?

সচেতন মানুষমাত্রই জানেন পেশাগত বিচ্যুতির জন্য আছে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং ফৌজদারী অপরাধের জন্য আছে আদালত। এই ব্যবস্থা সব পেশার মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। পুলিশের জন্যও পৃথক কোন ব্যবস্থা রাখেননি বিদগ্ধজনেরা। কারণ আইন সবার জন্য সমান। পদ্ধতিগত বিষয়টিও লাগসই হওয়া আবশ্যক। পণ্ডিতগণ ভোলেননি যে, প্রত্যেক পেশার কাজের ধরন ভিন্ন। কোন পেশাগত কাজে বিচ্যুতির অনুসন্ধান, অপরাধ বা নিরাপরাধের বিষয়গুলো নির্ধারণ বা মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় ওই পেশার প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, এমনকি বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের। সেজন্য পৃথক পেশাগত নেতৃত্ব এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এক পেশার বিদগ্ধজন অন্য পেশার অভিজ্ঞজনের সমকক্ষ হবেন কি? হয়তো কেউ কেউ তা মনে করতে পারেন। কিন্তু আজকের যুগে বাস্তবে সেটা সম্ভব নয়।

তারা কি জানেন না যে, এর আগেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খাজনা আদায়ের স্বার্থে পুলিশের নেতৃত্বে কালেকটরেট ভবনের প্রধান বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়েছিল। তখন তো ভেঙ্গে পড়েছিল সামগ্রিক আইন-শৃংখলা। সেদিনের অপেশাদার ম্যাজিস্ট্রেটগণ আইন-শৃংখলা রক্ষার ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিলেন। পেশাদার পুলিশও অপেশাদার নেতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। বিদ্যমান বাস্তবতার কারণে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮০৮ সালে পুলিশি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। পুলিশের কমান্ড ন্যস্ত করে এসপি’র কাছে। কিন্তু খাজনা আদায়কারীরা পুলিশের ওপর নেতৃত্বের মজা ভুলতে পারেনি। তাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চাতুর্যের সাথে পুলিশি নেতৃত্ব নিতে চেয়েছিল কালেকটরের অধীনে। ১৮২৯ সালে এসপিকে ন্যস্ত করেছিল বিভাগীয় কমিশনারের অধীনে। কিন্তু সেটাও কার্যকর হয়নি। তাই অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর জননিরাপত্তাকে সেদিন প্রাধান্য দিতে বাধ্য হয়েছিল। ১৮৬১ সালে এসে আইজিপির অধীনে পুলিশ বাহিনীর কমান্ড প্রতিষ্ঠিত করা হয়। 

জননিরাপত্তা সম্পর্কে যাদের ধারণা আর দশটা আমজনতার মতই, তারা নিছক ক্যাডার স্বার্থে স্বাধীন দেশে আবারও পুলিশের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তারা বোঝেন না সেদিনের চেয়ে আজকের আইন-শৃংখলা রক্ষা করা কত কঠিন। কত মেধা, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান আর দক্ষতার প্রয়োজন আজকের যুগে। তারা কি দেখেন না আজকের পুলিশ এ কাজটায় কত দক্ষ। কত দক্ষতার সাথে পুলিশ এদেশের সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সর্বহারা, নকশাল আন্দোলন দমন করেছে। এ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতির ক্ষেত্র থেকে উৎসারিত গোলযোগ, বিশৃংখলা সামলে দিয়েছে পুলিশ। কত দক্ষতার সাথে এদেশের পুলিশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করে চলেছে। জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রশংসাও কুড়াচ্ছে। আজকের মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির সাথে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তুলনা করলে এদেশের পুলিশের দক্ষতা সহজেই বোঝা যায়। এদেশে সামগ্রিকভাবে পুলিশের সাফল্য অন্য যে কোন বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ঈর্ষণীয়।

এটা অনস্বীকার্য যে, কোন অনৈতিক, অসাধু কাজকে কেউ সমর্থন করে না। হোক সেটা থানা, ফাঁড়িতে, হোক ভূমি অফিসে, রেজিস্ট্রি অফিসে, গ্যাস-বিদ্যুৎ, ব্যাংক-বীমা অথবা বড় অফিসগুলোতে।

সততা-অসততার প্রশ্নটা সবার জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। যদি বিভাগীয় ব্যবস্থা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের আওতায় যায়— সেটাও সার্বজনীন হওয়া প্রয়োজন। পুলিশের কনস্টেবলের অভিযোগটা যদি ডিসির নেতৃত্বে অনুসন্ধান হয়, তাহলে ডিসি অফিসের কারো বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তটাও এসপি’র অধীনে আসা উচিত। তবে কোন বিভাগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে বিভাগীয় ব্যবস্থা বা অনুসন্ধান। এটাও অপেশাদার চিন্তা। কারণ এতে অধস্তনদের কাজের ওপরে বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। ফলে ওই বিভাগের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি ভেঙ্গে পড়তে পারে। তাই এই কমান্ড, নিয়ন্ত্রণ বা নেতৃত্ব কখনোই ভাগাভাগি করা যায় না। এতে যে কোন প্রতিষ্ঠানেই অরাজকতা, বিশৃংখলা আরো বাড়বে।

সেটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অন্তত দুবার পরীক্ষা করে জেনেছে। এছাড়া কোন ইউনিফরম সার্ভিসের নেতৃত্ব দেবে সমকক্ষ অন্য সার্ভিসের অফিসার! পৃথিবীর কোন দেশে এরকম নজির আছে  কি? এক পেশার ওপর অন্য পেশার খবরদারির ফলাফলটা খুব ভালো হয় না। এর উদাহরণ বাংলাদেশে বিরল নয়। এ রকম ক্ষেত্রে খুব নিকট অতীতেই বেশ কিছু লোমহর্ষক ঘটানাও ঘটেছে এখানে। সেটা ভুলে গেলে আবার খেসারত দেবার আশঙ্কা আছে।

হুট করে আমাকে কেউ গালি দিয়ে বসতে পারেন। বলতে পারেন, তুমিও তো পুলিশ ছিলে। তাই তুমি পুলিশের পক্ষে সাফাই গাইছ। হ্যাঁ, আমি সেই পুলিশের পক্ষে গাইছি যে রাত জেগে মানুষের ঘুম নিশ্চিত করে, যে ছিনতাইকারীর কবল থেকে ট্যুরিস্টকে রক্ষা করতে প্রাণটা দেয়, মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য জীবন বাজি রেখে লড়াই করে। যারা নিজেদের ঈদ আনন্দ উপেক্ষা করে মানুষের আনন্দ নিশ্চিত করে। নানা প্রলোভন উপেক্ষা করে যে পুলিশ অফিসার সৎ থাকে তার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। এক লাখ ছাপান্ন হাজার পুলিশ সদস্যের মধ্যে থানা-ফাঁড়িতে, হাইওয়েতে কাজ করে মাত্র ৩৫ হাজার জন। এদের মধ্যে কেউ কেউ অপরাধে জড়ায়। তাদেরকে ছাড় দেয় না ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। অপরাধে জড়িয়ে ২০১৪ সালে ৮০ জন পুলিশ সদস্য চাকরিচ্যুত হয়েছে। গুরুদণ্ড পেয়েছে ৭৬২ জন। লঘুদণ্ড হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার।

অর্থাৎ বিপথগামীকে প্রশ্রয় দেয় না পুলিশ বিভাগ বা প্রতিষ্ঠান। তাহলে বাকী ১ লাখ ২০ হাজার সদস্য কেন অন্যের অপরাধ বা কর্তব্যচ্যুতির অপবাদ নেবে? তারপরেও পুলিশ কর্তৃক উদঘাটিত কয়েকজন সদস্যের অপরাধকে নিয়ে সিন্ডিকেড প্রচারণা চলছে। অতি সরলীকৃত, অবৈধ সাধারণীকৃত অপবাদ আনা হয় পুরো পুলিশ বাহিনীর বিপক্ষে। বলা হয় পুলিশ অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে, দুর্নীতিতে নিমজ্জিত।

পুলিশের সৎ অফিসার/সদস্যদের জন্য এটা অস্বস্তিকর, পীড়াদায়ক এবং মানহানিকর। অন্য কোন বাহিনীর সদস্য অপরাধ করলে সেই বাহিনীর সদস্য বলে রিপোর্টে উল্লেখ করে এদেশের মিডিয়া। পুলিশের সদস্য হলেই পুরো বাহিনীর ওপর দোষ চাপে।

হ্যাঁ, পুলিশ নিজেই চেয়েছে স্বচ্ছ হতে, জবাবদিহি হতে জনগণের কাছে। চেয়েছে উন্নত দেশের পুলিশের মত জনতার পুলিশ হতে। সেজন্য নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন থেকে শুরু করে শাস্তি বা পুরস্কারের ক্ষেত্রে পুলিশ সংস্কার কর্মসূচি (পিআরপি) বারবার পুলিশ আইনের সংশোধন চেয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মেধা, অভিজ্ঞতা এবং বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সমন্বয়ে প্রণয়ন করেছিল ‘পুলিশ আইন ২০০৭’ এর খসড়া।  সেটাও আলোর মুখ দেখেনি। রয়েছে মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি। বিচারিক ক্ষমতা হারিয়ে দিশেহারা তারা। পুলিশের ওপর নিয়ন্ত্রণ যদি হারিয়ে যায়- তাহলে এক জমি পাঁচবার রেকর্ড করার পর জনতার প্রতিক্রিয়া কি হবে সেটা কে না জানে।

তাই পুলিশকে কোনভাবেই জনতার পুলিশ হতে দেয়া হচ্ছে না। প্রশাসন ক্যাডারের তাবেদার করে রাখার অপচেষ্টা চলছে। প্রগতির পথে না হেঁটে সেই ঔপনিবেশিক কাঠামোকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে মন্ত্রণালয়। কে ভাঙবে সেই বৃত্ত? যখন রাজনৈতিক, সরকারের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এবং পারিপার্শ্বিক সমর্থন না পায়, তখন কি একটি বাহিনী দায়িত্বশীলভাবে বিকশিত হতে পারে? স্বাধীনভাবে কাজ না করলে সেই বাহিনীতে কি সার্বজনীনভাবে ভালো সদস্য নিয়োগ, পদোন্নতি এবং পদায়িত হতে পারে? সেটা নিশ্চিত বা চিহ্নিত না করে পুলিশকে দোষারোপ করা যায়। সেটা খুবই সহজ। সুবিধাবাদীরা যদি বিয়ে না করে বউ পায়- তাহলে অসুবিধা কোথায়? 

বিগত আড়াই বছর ধরে কিছু শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং কোন কোন গোষ্ঠী এদেশে বিশৃংখলা সৃষ্টির চেষ্টা  করেছে। জনজীবনে বিপর্যয় এনেছে। নিজেদের জীবন উত্সর্গ করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এদেশের মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দিয়েছে পুলিশ। এখন আপাতত শান্ত সময়। কিন্তু সরকার ব্যবস্থাপনায় অশান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে কেউ কেউ। এ সময় কোন কোন রাজনৈতিক দল বলছে পুলিশ সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে। সেক্ষেত্রে তাদের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ক্ষেত্রে মূল প্রতিপক্ষ হচ্ছে পুলিশ। 

তাই জনগণের কাছে পুলিশকে বিতর্কিত করার, অগ্রহণযোগ্য করার ষড়যন্ত্র চলাও অস্বাভাবিক নয়। এ সময় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোন প্রতিষ্ঠান পুলিশের মুখোমুখি হওয়া এক অশনি সংকেত বহন করে। অপরাধের দায়ে পুলিশ বাহিনী থেকে বের করে দেয়া, পুলিশ যাদেরকে গ্রেফতার করেছে তাদের জন্য পুরো বাহিনীকে বিতর্কিত করতে, বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে দিতে পুলিশি নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা এবং ঢালাও অপপ্রচার চলছে। পেশাগত দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলবো পুলিশ সম্পর্কে একটি রাজনৈতিক দলের অপপ্রচার, মন্ত্রণালয়ের ওই সার্কুলার এবং মিডিয়ায় প্রচারণা বিচ্ছিন্ন কিছুই নয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহলের উচিত এ বিষয়টার গভীরে খতিয়ে দেখা। পুলিশের উচিত পেশাদারিত্বের সাথে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা।


মোঃ আব্দুর রউফ, পিপিএম

সাবেক আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ।

Share on: