'মেঘে ঢাকা তারা' ঋত্বিক ঘটকের এক অনন্য সৃষ্টি

বার্তা জগৎ ডেস্ক:

প্রকাশিতঃ ১ অগাস্ট ২০১৯ সময়ঃ ভোর ৫ঃ০১
'মেঘে ঢাকা তারা' ঋত্বিক ঘটকের এক অনন্য সৃষ্টি
'মেঘে ঢাকা তারা' ঋত্বিক ঘটকের এক অনন্য সৃষ্টি

 

আফছানা কর্ণিয়াঃ

মনমুগ্ধকর ট্রাজেডি বলতে যদি কিছু থাকে তবে এই বিশেষণ ''মেঘে ঢাকা তারা''ই প্রাপ্য। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে মনে করি শুধুমাত্র দর্শক টানার জন্য অবাস্তবধর্মী Thriller, mystery, action নির্ভর সিনেমা থেকে যেসব সিনেমা মানুষের জীবন যাত্রা ও মনস্তান্তিক দিকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয় সেখানেই লেখক ও পরিচালকের আসল বুদ্ধিমত্তা ও মননশীল পরিচয় পাওয়া যায়। এইখানেই তার প্রকৃত সফলতা। শক্তিপদ রাজগুরুর বড় গল্প অবলম্বনে তৈরি ঋত্বিক ঘটকের 'মেঘে ঢাকা তারা' অনেক সমালোচক ও পরিচালককে অবাক করতে বাধ্য তো করেছেই সেই সাথে ঋত্বিককে তুলনা করা হয়েছে স্ট্যানলি কুবরিকের সাথে আর 'মেঘে ঢাকা তারা' কে তুলনা করা হয়েছে কুবরিকের 'ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জের' সাথে। সত্যজিৎ রায় তো ঘটক সম্পর্কে বলেই দিয়েছেন, ''সে তো আমার থেকেও বড় প্রতিভা।''

ঘটক সাহেব ছবিতে নীতা নামের সংগ্রামী ও স্বার্থহীন এক নারীর গল্প দর্শকের হৃদয়ে আঁকতে চেয়েছেন। যার সকল চিন্তাভাবনা বাবা-মা, বড় ভাই শংকর, ছোট ভাই বোন মন্টু ও গীতা কে নিয়ে। শংকর এর সকল ধ্যান-জ্ঞান শাস্ত্রীয় সংগীতকে নিয়ে। একদিন সংগীত শিল্পী হয়ে অনেক নাম কামাবে। নীতাও তাঁর প্রিয় ভাইকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখে প্রেমিক সনৎ কে নিয়ে, যে তার জন্য অনেক উপমা দিয়ে চিঠি লেখে। কিন্তু যখনই নিজের পরিবারের দিকে তাকায় তখনই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগানোর দুঃসাহস কে মাটি চাপা দিতে হয় তাকে। ছোট ভাই মন্টু গার্মেন্টসে এক্সিডেন্ট করলে সেখানেও প্রচুর টাকা খরচ হয়ে যায়। সংসারের ঘানি টানতে টানতে ধীরে ধীরে নীতা অসুস্থ বোধ করে। অন্যদিকে সনৎ এর সাথে সাক্ষাৎ হতে থাকে নিতার ছোট বোন গীতার সাথে। যে কিনা নিজের সুখ, আহ্লাদ, আনন্দকেই সবার উপরে স্থান দিয়ে বসে আছে। তার মিষ্টি মিষ্টি হাসি ও রসালো কথায় তাকে নিয়ে সংসার করার লোভে পড়ে যায় সনৎ, দু'জনের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। এ যেন ভালবাসাকে তুচ্ছ করে মোহের জয়। আর এই দৃশ্য দেখে নীতা নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। তার সামনে যেন সমস্ত কালো মেঘ এসে পড়ে। দিক শুন্য ও অন্ধকার হয়ে পড়ে চারিদিক। এদিকে বড় ভাই একদিন সত্যি সত্যি মস্ত বড় শিল্পী হয়ে তাদের মাঝে ফিরে আসে। সব সময় নিজের পরিবারের কাছে ছোট হয়ে থাকা সেই শংকর আজ হঠাৎ পরিবারের মধ্যমনি হয়ে উঠে। ফিরে এসেই শংকর তার প্রিয় বোন নীতার খোঁজ নেয়। কিন্তু ততদিনে নীতা ভিনগ্রহের বাসিন্দা। সে কারো সাথে কোন কথা বলে না, কারো সাথে খায় না, এমন কি তার প্লেট পর্যন্ত কাউকে ছুতে দেয় না। সে যেন এই পরিবার থেকে নির্বাসনে গিয়েছে। তার কাছে গেলে সে কি যেন একটা লুকিয়ে ফেলে। বড় ভাই ভাবে, এই বুড়ো বয়সে প্রেমের ভীমরতি ধরেছে। পত্র এসেছে নীতার কাছে ঠিকই কিন্তু সেটা এসেছে 'মেঘে ঢাকা তারা'র পক্ষ থেকে। তারা জানান দিয়েছে সে এখন আর সাধারণ তারা নয়, সে এখন মেঘে ঢাকা তারার দলে। নীতার অনেক পুরনো ইচ্ছা তার ভাই কে নিয়ে পাহাড়ের উপরে বেড়াতে যাবে। ইচ্ছা তার পূরণ হয় ঠিকই কিন্তু উপভোগ আর হয় না। কারণ সে তো এখন মেঘে ঢাকা তারা, চাইলেই সে এখন তারাদের দলে যোগ দিতে পারবে না। কিন্তু এমন জীবন সে তো চায়নি। ভাইয়ের কাছে সে করুণ মিনতি জানায়, ''আমি তো এমন হতে চাইনি, আমাকে তোমাদের মত বাঁচতে দাও, আমি তো শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম । আমি বাঁচতে চাই দাদা।''

মেঘে ঢাকা তারা যত সুন্দর তার চেয়েও সুন্দর এর কাহিনীর গভীরতা, এর চরিত্রের গভীরতা। এরকম শত শত নারীর চিত্র আঁকা হয়েছে যারা পরিবারের জন্য সংগ্রাম করে যায়, যাদের জুতা ক্ষয়ে যায় তবুও পরিবারের মানুষগুলোর জন্য যারা জুতার চিন্তা না করে খালি পায়ে হাঁটতে সর্বদা প্রস্তুত। তারপরেও পরিবারের মানুষজনের কাছে তারা দাম পায় না, স্বার্থ যতক্ষণ ততক্ষণ ই তারা অন্যের দ্বারা ব্যবহার হয়, তাদের কথা কেউ ভাবে না। তারা ঠিক আকাশের মেঘে ঢাকা তারার মতন। মেঘে ঢাকা তারা গুলর কারণেই আমরা এতোটা উজ্জ্বল হয়ে আলো ছড়াতে পারছি ।

ব্যক্তিগত মতামতঃ এদেশে বড় ছেলের কষ্ট নিয়ে নাটক সিনেমা হয়েছে, বেকার ছেলের প্রেমিকা বিসিএস ক্যাডারের হাত ধরে চলে যায় এরকম ইমম্যাচিওর ও মিথ্যা রস মিশানো কাহিনী গল্প অনেক হয়েছে। কিন্তু সত্যিকারের মাস্টারপিস গল্প, নাটক, সিনেমা থেকে আমরা এখন অনেক দূরে সরে গিয়েছি। ওইগুলোর সাথে ঋত্বিক, সত্যজিতের অপূর্ব সৃষ্টির তুলনা কোনভাবেই সম্ভব নয়। তবে উপমহাদেশেও যে কত মনমুগ্ধকর ন্যাচারাল ও সত্য কাহিনী নিয়ে সাহসী সিনেমা হয়েছে সে সম্পর্কে নবীনদের জানান দিতেই আমার খুবই সামান্য এ প্রচেষ্টা। 

বার্তা জগৎ২৪/ এম এ