• বৃহস্পতিবার, ৬ মে ২০২১ , ২৩ বৈশাখ ১৪২৮
  • আর্কাইভ

বৃহস্পতিবার, ৬ মে ২০২১ , ২৩ বৈশাখ ১৪২৮

শতবর্ষে সত্যজিৎ : ফেলে আসা সোনালী দিনগুলো ফিরে দেখা

সায়ন গুপ্ত:
প্রকাশিত :বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৯, ২০২১, ০৬:৫৬

  • সত্যজিৎ রায়

    ছিপছিপে চেহারা, মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল, চোখ দুটো গোল গোল, এমনটাই ছিল মায়ের আদরের মানিক। ছোটবেলা থেকেই তার পোশাক, চলন-বলন ছিল আভিজাত্যে ভরা। যেন বাংলার বুকে এক শিল্প-সাধকের আবির্ভাব হল।


    শুরুর কথা

    সত্যজিৎ রায়ের আদি ভিটা ছিল বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে। তাঁর গোটা পরিবার ছিল সাহিত্যমনা। ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায় ছিলেন একাধারে দার্শনিক, সাহিত্যিক ও চিত্রকর এবং পিতা, প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়। ছোটবেলায় বাবাকে হারানো মানিকের অনুপ্রেরণা ছিলেন তার মা সুপ্রভা দেবী। কখনই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় তার মন বসেনি। সাহিত্যপ্রেমী সত্যজিৎ পড়তে চেয়েছিলেন ইংরেজি সাহিত্য। কিন্তু বাবার এক বন্ধুর পরামর্শে তিনি অর্থনীতি নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতক স্তরে ভর্তি হন। কলেজ পর্ব মিটিয়ে, মায়ের মন রাখতে চিত্রকলা শিখতে পাড়ি দেন শান্তিনিকেতনে। শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন বিজ্ঞাপনের প্রতি আগ্রহ তৈরী হয় তাঁর মনে। কিন্তু শান্তিনিকেতনে তা শেখার সুযোগ ছিল না। এই সময় তিনি এক অমূল্য রত্ন ভান্ডারের সন্ধান পান। স্কুল জীবন থেকেই তার বিদেশি ছবি (মূলত হলিউড) দেখার একটি বিশেষ আগ্রহ ছিল। স্টুডিওর ব্যবহার, ক্যামেরার কারসাজি, কলাকুশলীদের অভিনয়ের মাধ্যমে কয়েক ঘন্টায় একটা আস্ত গল্পকে বাস্তবায়িত করার কাজটা ছোটবেলা থেকেই তাঁকে টানত। এক গ্রন্থাগার থেকে তিনি খুঁজে পান চলচ্চিত্রের কিছু বই। যা তাঁর আগ্রহের ফুলকিকে দাবানলে রূপান্তরিত করে।


    পুরানো সেই দিনের কথা

    ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। কলকাতায় তারা বেশকিছু ঘাঁটি তৈরি করেছে। কলকাতায় তখন জাপানের 'বোমাবর্ষণ আতঙ্ক'। এমন অবস্থায় সত্যজিৎ শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় ফিরলেন। সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর মনোরঞ্জনের জন্য প্রচুর হলিউড ছবি কলকাতায় মুক্তি পেতে শুরু করে। হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে সেই সব সিনেমা প্রায় প্রতিদিন দেখতে শুরু করেন তিনি। কিছু দিনের মধ্যেই কলকাতায় মুক্তিপ্রাপ্ত সমস্ত বিদেশি ছবির নাম, প্রযোজক কোম্পানি, এমনকি স্টুডিওর নাম মুখস্থ করে ফেলেন তিনি। ছবি দেখে বেরিয়ে ছবিতে কোথায় কোন শট-এর ব্যবহার করা হয়েছে, কাটের ধরন কেমন ছিল, এই সব বিষয়ে বন্ধুদের সাথে গল্পে মেতে থাকতেন।এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল তাঁর স্মৃতিশক্তি ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা।

    ছাত্রজীবন ফেলে কর্মজীবনে প্রবেশ

    পরিচালক হিসেবে পথচলার আগেই ১৯৪৩ সালে একটি ব্রিটিশ কোম্পানির হয়ে জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে বিজ্ঞাপন বিভাগে কাজ শুরু করলেন। পাকাপাকিভাবে পরিচালক হিসেবে পরিচিতি লাভের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ওই কোম্পানিতে বিজ্ঞাপন বিভাগে কাজ করতেন।

    ১৯৪৯ সালে ফরাসি পরিচালক জিন রেনোয়া কলকাতা পরিভ্রমণে আসেন। তার ছবি 'লা গ্রান্দে ইলিউশান' প্রথম বিদেশী ভাষার ছবি হিসেবে অস্কারের জন্য মনোনীত হয়। প্রিয় পরিচালককে কাছে পাওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করেননি সত্যজিৎ। রেনোয়ার সাথে গাইড হিসেবে কলকাতা ও কলকাতার বাইরের কিছু জায়গায় ঘোরেন তিনি। এই সামান্য সময়ে রেনোয়ার প্রিয় ছাত্রও হয়ে ওঠেন সত্যজিৎ।

    ১৯৫০সালে কোম্পানি থেকে তাকে পাঁচ মাসের জন্য লন্ডনের হেডকোয়াটারে পাঠানো হয়। লন্ডনে কর্মরত অবস্থায় রেনোয়া সহ বেশকিছু বিশ্বনন্দিত ফরাসি পরিচালকদের কালজয়ী চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ পান। এরইমধ্যে ইতালিয় নবীন পরিচালক ভিত্তোরিও-ডি-সিকার পরিচালিত 'বাইসাইকেল থিভস' ছবিটি দেখেন। ছবিটি তাঁর গোটা জীবন পাল্টে দেয়।


    পরিচালনার সাধনা শুরু


    ১৯২৯নসালে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা 'পথের পাঁচালী' ইতিমধ্যেই 'ক্লাসিক' হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তবে সেই গ্রন্থকে পর্দায় তুলে ধরার বিষয়ে কেউই কখনো আগ্রহ প্রকাশ করেনি। গোড়া থেকেই সত্যজিৎ চাইতেন এমন এক স্বল্প খরচে ছবি বানাতে যেখানে কোন মেকআপ থাকবে না। ঝাঁ-চকচকে পোশাক, জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকা কাউকেই ব্যবহার করা হবে না। শুটিং হবে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে। তার এই চিন্তা ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতেই তিনি বেছে নেন বিভূতিভূষণের 'পথের পাঁচালী' কে। তবে প্রাথমিকভাবে কেউই এই সিনেমায় বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক হন নি। কারণটা ছিল মূলত জৌলুসের অভাবে। এক সময় এই পরিকল্পনাটিকে তার অলীক সুখ কল্পনা বলে মনে হতে শুরু হয়েছিল। তিনি ঠিক যেভাবে পরিচালনার কথা ভেবেছিলেন, 'বাইসাইকেল থিভস' ছবিটিতে ঠিক সেভাবেই পরিচালনার কাজটি করে দেখান ডি সিকা। সেই দেখে সত্যজিতের মনে বিশ্বাসের স্ফুলিঙ্গ জাগে। কলকাতা ফিরেই প্রয়াত বিভূতিভূষণ-এর স্ত্রী রমা দেবীর কাছে পথের পাঁচালীর স্বত্ব চাইতে একাধিকবার যান। এমন জেদি নবীন পরিচালক, যার চোখে একরাশ স্বপ্ন, তা দেখে রমা দেবী সত্যজিৎকে ফিরিয়ে দিতে পারেননি। কিন্তু এরপরেও শুটিং শুরু করা যায়নি। প্রাথমিকভাবে ছবিটির বাজেট ধরা হয়েছিল ৭৭০০০ টাকা। বন্ধুদের থেকে সাহায্য নিয়ে তিনি ১৭০০০ টাকা জোগাড় করতে সক্ষম হন। আনকোরা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে শুরু হয় শ্যুটিং-এর কাজ। ক্যামেরার সামনে ও পেছনে প্রত্যেকেই নতুন। কিন্তু শুটিং শুরুর দিন কয়েকের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যায়। অর্থের ভাঁড়ার শুন্য। ছবি তৈরীর জন্য ইতিমধ্যেই তিনি বিজ্ঞাপন বিভাগের কাজটি ছেড়ে দিয়েছেন। নিজের জমানো পশ্চিমী গানের কালেকশনও বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু তাও যথেষ্ট ছিল না। এর মধ্যে আবার দুর্গার চরিত্রে অভিনয় করা মেয়েটি দারিদ্র্যের কবলে পড়ে শরীরের গঠন পাল্টে যাচ্ছে। প্রযোজকদের দরজায় দরজায় ঘোরার পর যখন ছবি তৈরীর আসা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন তখন হঠাৎ খেয়াল হল তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের কথা। মুখ্যমন্ত্রী নিজে সারাজীবনে হাফ ডজন সিনেমা দেখেছেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ওনার সিনেমা সম্বন্ধে তেমন কোনো উৎসাহ নেই জেনেও সত্যজিৎ এই শেষ সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাননি। বি সি রায় তাকে সাহায্য করতে রাজি হন কেবলমাত্র তিনি সুকুমার রায়ের ছেলে বলেই। এর আগে সরকারি সাহায্য নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরীর বিষয়ে কেউ কখনো ভাবতেই পারেনি। তিন বছর টানা শুটিং চলার পর অবশেষে ১৯৫২ সালের ২৭শে অক্টোবর ছবিটি বড় পর্দায় মুক্তি পায়।

    বাংলার প্রথম 'মুভি ক্লাব'

    পরিচালনার কাজ শুরু করার আগে সত্যজিৎ রায় ১৯৪৭ সালে বাংলার প্রথম মুভি ক্লাব চালু করেন। সেখানে দেখানো প্রথম ছবিটি ছিল সার্গেই আইজেনস্টাইনের 'ব্যাটেলশিপ পটেমকিন'।

    বাংলা তথা ভারতের প্রথম 'নিজস্বী'

    সত্যজিৎ রায়ের ডায়েরির পাতা উলটে অসংখ্য ছবির মধ্যে এমন একটি ছবি পাওয়া গিয়েছিল যার তলায় লেখা "আমি আর মা। নিজেই ছবিটা তুললাম। ক্যামেরার শাটারে সুতো বেঁধে রেখেছিলাম। পরে আমিই তাতে টান দি।" ছবিটিকে নিঃসন্দেহে বাংলা তথা ভারতে তোলা প্রথম 'সেলফি'-র শিরোপা দেওয়া যায়।

    বিশ্বমঞ্চে বাংলার জয়তোরণ

    ১৯৮৭সালে 'লিজিয়ন অফ অনার'-এর পুরষ্কার মঞ্চে তৎকালিন ফরাসি রাষ্ট্রপতি ফ্রান্সোইস মিতের এর হাত থেকে পুরষ্কার নেওয়ার পর মিতের ফরাসি ভঙ্গিতে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য থুতনিতে চুম্বন করতে যান। কিন্তু বিনম্রভাবে সত্যজিৎ তাকে বারণ করেন এবং স্বভাবসিধ্য ঢঙে হাত জোড় করে প্রনাম করেন, যার মাধ্যমে বাংলা তথা বাঙালিয়ানাকে বিশ্ব মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেন।


    শিশু-সাহিত্যিক সত্যজিৎ

    গুপি-বাঘাই হোক, কিংবা ফেলুদা, তোপসে, জটায়ু, মুকুল সত্যজিৎ রায়ের ছবির এই সব চরিত্রগুলি ছোটো-বড়ো সকলের কাছেই খুব প্রিয়। শিশুদের মন বোঝা নেহাতই সহজ কাজ নয়। কিন্তু সত্যজিৎ রায় শিশুদের মনোগ্রাহি একের পর এক চলচ্চিত্র পরিচালনা করে গেছেন। তাঁর লেখা প্রতিটি গল্পে সাহিত্য প্রেমী পায় নতুন নতুন 'মানে'। তাঁর ছবিগুলিতে শিশুদের জন্য যেমন রয়েছে সারল্য, তেমনই বয়স্কদের জন্যও ছিল শিক্ষনীয় সমাজবোধ ও রাজনীতিবোধ। তা সে 'হীরক রাজার দেশে' ই হোক কিংবা হোক 'সোনার কেল্লা'।

    প্রকাশে বাঁধা

    তাঁর নির্মিত ডকুমেন্টারি ফিল্ম 'সিকিম' প্রকাশে বাঁধার সম্মুখীন হয়। ১৯৭১ সালে তিনি ডকুমেন্টরিটি শ্যুট করেন। কিন্তু সীমান্তজনিত রাজনৈতিক কারণে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তা প্রকাশ্যে আনার অনুমতি দেওয়া হয়নি। অবশেষে ২০১০সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিকিম জনসমক্ষে মুক্তি পায়।

    শেষের দিলনগুলো

    আশির দশকে তিনি প্রথম বার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পরেও তার কাজকে নিজের থেকে দূরে থাকতে দেন নি। 'ঘরে-বাইরে', 'গণশত্রু', 'শাখা-প্রশাখা' ও 'আগন্তুক' তার জীবনের শেষ কয়েকটি কাজ হিসেবে আমাদের কাছে চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে। অসুস্থতার কারণে শ্যুটিংয়ের অধিকাংশ অংশ তাকে স্টুডিওর মধ্যেই সারতে হয়।


    সত্যজিৎ রায় যখন অস্কার পান, তখন তিনি অসুস্থ হয়ে কলকাতার বেলভিউ নার্সিংহোমে ভর্তি। মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগেই ভারতরত্নে ভূষিত হন তিনি। অক্সফোর্ড থেকে তাকে সান্মানিক 'ডক্টরেট' ডিগ্রি দেওয়া হয়, যা চার্লি চ্যাপলিনের পর দ্বিতীয় ফিল্ম ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি পান।

    দীর্ঘ লড়াইয়ের পর, ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল, ৭১ বছর বয়সে, টিম টিম করে জ্বলতে থাকা প্রাণটি ধপ করে নিভে যায়। আজ বাংলা সাহিত্য ঠিকরেও চলচ্চিত্রের জগৎটাই হয়তো অন্যরকম হত যদি না সত্যজিৎ রায় বিজ্ঞাপন বিভাগের কাজটি ছাড়তেন। তিনি ছিলেন এক আলোর রোশনাই যা ঠিকরে বেরিয়ে দেখিয়েছিল 'অসম্ভব' এর মধ্যেই 'সম্ভব' শব্দটা লুকিয়ে আছে। তাই শতবর্ষ পার করে সকলের প্ৰিয় মানিকদা আজও বিশ্বনন্দিত ও বাংলা তথা বাঙালির গর্ব।

    সায়ন গুপ্ত


    /

    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    শনি
    রোব
    সোম
    মঙ্গল
    বুধ
    বৃহ
    শুক্র

    সম্পাদক: দিদারুল ইসলাম
    প্রকাশক: আজিজুর রহমান মোল্লা
    মোবাইল নাম্বার: 01711121726
    Email: bartajogot24@gmail.com & info@bartajogot24.com