• বৃহস্পতিবার, ৬ মে ২০২১ , ২৩ বৈশাখ ১৪২৮
  • আর্কাইভ

বৃহস্পতিবার, ৬ মে ২০২১ , ২৩ বৈশাখ ১৪২৮

কুতুবদিয়া : অপূর্ব সৌন্দর্যমন্ডিত নির্জন এক দ্বীপ

সানজিদা জাহিন প্রিমা:
প্রকাশিত :বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৯, ২০২১, ১১:২২

  • কুতুবদিয়া

    পড়ন্ত বিকেলে জীবনের জটিল সমীকরণ থেকে বিরতি নিতে নির্জন কোনো দ্বীপে চলে যেতে কখনো ইচ্ছে হয়নি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। জনসমাগম আর কর্মব্যস্ততা থেকে ছুটি নিয়ে কম খরচে অবকাশ যাপনের জন্য আপনার অন্যতম সেরা পছন্দ হবে সাগরকন্যা "কুতুবদিয়া"ভ্রমণ। অপূর্ব সৌন্দর্যমন্ডিত দ্বীপটিতে ভ্রমণের আগে এক পলকে দেখে নেয়া যাক সব খুঁটিনাটি-


     

    কুতুবদিয়ার কালানুক্রমিক ইতিহাস

     

    প্রায় ছয়শত বছর আগে সমুদ্রের বুক চিরে জেগে উঠে কুতুবদিয়া দ্বীপ। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষার্ধে এই দ্বীপে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। সর্বপ্রথম ‘কুতুবুদ্দীন’ নামক একজন সাধু ও পরহেজগার ব্যক্তি আলী আকবর, আলী ফকিরসহ কিছু সঙ্গী নিয়ে মগ পর্তুগীজ বিতাড়িত করে এ দ্বীপে আস্তানা স্থাপন করেন। উদার এই ব্যাক্তি এক সময় সবার জন্যই এই দ্বীপটি উন্মুক্ত করে দেন ও বসবাস উপযোগী করার ব্যবস্থা করেন।

    তখন আরাকান রাজ্য থেকে বিতাড়িত মুসলিমরা আশ্রয়ের জন্য এই দ্বীপে আসতে থাকে। কুতুবুদ্দীন এদেরকেও সাদরে আশ্রয় দান করেন।আর তাই তাকে সম্মান করে করে কুতুবুদ্দীনের নামানুসারে দ্বীপটির নাম রাখা হয় কুতুবদিয়া দ্বীপ। প্রথমে দ্বীপটির নাম ছিলো ‘কুতুবুদ্দীনের দিয়া’ যা পরবর্তীতে কালের বিবর্তনে লোকমুখে পরিবর্তন হয় এবং হয়ে যায় ‘কুতুবদিয়া দ্বীপ’।

     

    প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার কুতুবদিয়ার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পরে বর্তমান আয়তন প্রায় ২১৫ বর্গকিলোমিটার।

     

    কক্সবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপে ১৯১৭ সালে কুতুবদিয়া থানা গঠিত হয় এবং ১৯৮৭ সালে উপজেলাতে রুপান্তর করা হয়। ৬ টি ইউনিয়ন বিশিষ্ট এই উপজেলায় জনসংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ৩৫ হাজার। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা হলেও এখানে হিন্দু, বৌদ্ধসহ অন্য ধর্মালম্বীর জনগোষ্ঠীর বসবাস পরিলক্ষিত হয়।

     

    কুতুবদিয়ায় কেন যাবেন

     

    ভ্রমণপিয়াসীদের জন্য কুতুবদিয়া একটি ফুল প্যাকেজ।এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের পাশাপাশি শতবছরের ঐতিহ্য আর স্থানীয়দের বিচিত্র জীবনযাত্রা সবাইকে মোহিত করে। কুতুবদিয়ায় জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি রয়েছে ঐতিহাসিক বাতিঘর, প্রাচীন স্থাপত্য কালারমার মসজিদ, বিশাল মৎস্য ভান্ডার, শুটকিপল্লী, বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কুতুব শরীফ দরবার, কুতুব আউলিয়ার মাজার, সমুদ্র সৈকত, প্রাকৃতিক উপায়ে লবণ তৈরির বিস্তীর্ণ মাঠ, কুতুবদিয়া বাতিঘর, সরকারি স্টেডিয়াম, কালারমার মসজিদ, ফকিরা মসজিদ, ধুরুং স্টেডিয়াম, সিটিজেন পার্কসহ বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য স্থান।

    চলুন দেখে নেয়া যাক এ দ্বীপে গেলে কোন কোন দর্শনীয় স্থানে ঢু মারতেই হবে-

     

    বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র

     

    বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র কুতুবদিয়ায় অবস্থিত। প্রায় এক হাজার কিলোওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন এই বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে সৈকতের দক্ষিণ প্রান্তে। কুতুবদিয়া উপজেলার আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের তাবলারচর গ্রামের বেড়িবাঁধের পাশে বিস্তীর্ণ এলাকায় ৫০টি টারবাইন (বায়ুকল) দিয়ে প্রথমে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন এই প্রকল্প স্থাপন করা হয়।


    কিন্তু প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখার আগেই ২০১০ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর গত ২০১৬ সালে আবার নতুন আঙ্গিকে ২০টি টারবাইন দিয়ে বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে। এটি উদ্বোধনের মাধ্যমে শুরু হয় ২ মেগাওয়াট বিদুৎ সরবরাহ। দ্বীপের বিদ্যুৎ চাহিদার অনেকাংশই পূরণ করছে এই বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প। আর এটি পেয়ে আনন্দিত কুতুবদিয়া উপজেলার মানুষ।

     

    কুতুবদিয়া বাতিঘর

     

    প্রযুক্তির উৎকর্ষের আগে সামুদ্রিক জাহাজে উন্নত যন্ত্রপাতি ছিল না, অভিজ্ঞ নাবিকরা প্রাচীন প্রচলিত পদ্ধতিতে সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিতেন।বঙ্গোপসাগরেও ব্যতিক্রম ছিল না, তাছাড়া প্রাকৃতিক দু্র্যোগের কবলে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় চর জেগে উঠত।

     

    তাই, নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচলের স্বার্থে ব্রিটিশ সরকার বাতিঘর স্থাপনের করার পরিকল্পনা করে এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে তিন দিকে বঙ্গোপসাগর পরিবেষ্টিত কুতুবদিয়ায় একটি সুউচ্চ বাতিঘর স্থাপন করা হয়।

     

    বাতিঘরের বিচ্ছুরিত আলো ২৫ থেকে ৩৫ কিলোমিটার গভীর সমুদ্র থেকে দেখা যায়। জাহাজের নাবিকদের সঠিকপথ দেখানোর জন্য বিভিন্নসময় বঙ্গোপসাগর ঘেষা বিভিন্নস্থানে বাতিঘর তৈরী হলেও সবচেয়ে প্রাচীন বাতিঘর স্থাপিত হয় কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়ায়।

     

    পুরোনো দৃষ্টিনন্দন বাতিঘরটি অনেকবার ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের কবলে পরে বারবার আঘাত প্রাপ্ত হয়,১৯৬০ সালের প্রলয়ঙ্কারী ঘুর্ণিঝড়ে তা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তীতে নতুন বাতিঘর তৈরী করা হয় যা বর্তমানে নাবিকদের দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করছে।

     

    বড়ঘোপ বাজার থেকে সমুদ্রসৈকত ধরে উত্তর দিকের অদূরে বর্তমান বাতিঘরের অবস্থান। কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার এই বাতিঘর পর্যটকদের কাছে বেশ রোমাঞ্চকর একটি স্থান। তাই প্রতিনিয়ত এখানে পর্যটকের আনাগোনা দেখা যায়।

     

    কুতুবদিয়া চ্যানেল

     

    বেশ বড় এই চ্যানেল সারা বছর বেশ উত্তাল থাকলেও শীতে মোটামুটি শান্তই থাকে। মাগনামা ঘাট থেকে এই চ্যানেল পাড়ি দিয়েই পৌঁছতে হবে কুতুবদিয়া দ্বীপে।

     

    কুতুবদিয়া সমুদ্র সৈকত

     

     

    বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া। অনাবিল সৌন্দর্যের আধার এই দ্বীপের পশ্চিম পাশে কূল ঘেঁষে প্রায় ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ সমূদ্র সৈকত। লোকসমাগমে মুখরিত দেশের অন্যান্য সমুদ্র সৈকত থেকে কুতুবদিয়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের দিক দিয়ে কোন অংশেই কম নয়। বরঞ্চ এই সৈকতের নিরিবিলি পরিবেশ ক্লান্ত প্রাণে আরো বেশি প্রশান্তি দেয়।জলধির নীল জলরাশির কলতান শ্রবণইন্দ্রিয়কে উতলা করে, নিয়ে যায় অন্য এক জগতে। এখানে অন্যান্য সৈকতের  পর্যটকের আনাগোনা নেই বললেই চলে। জেলেদের কর্মব্যস্ততা আর কিশোরদের দুরন্তপনায় মুখরিত থাকে এই প্রাঙ্গন। ডানামেলা গাঙচিলের অবাধ বিচরণ বেসুরা গলায়ও সুরের আহবান জানায়। কোথাও আবার সৈকতের পাশে আছে ঝাউগাছের সারি।


    নির্জনতার সুযোগে সৈকতের কোথাও কোথাও লাল কাঁকড়াদের দল ঘুরে বেড়ায় নির্ভয়ে, সদর্পে। পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখার জন্য কুতুবদিয়ার সৈকত  যেন এক স্বর্গীয় স্থান।

     

    কুতুব আউলিয়ার দরবার

     

    কুতুবদিয়া উপজেলার ধুরং এলাকায় কুতুব আউলিয়ার দরবার শরীফ। এই দরবারের প্রতিষ্ঠাতা শাহ আব্দুল মালেক আল কুতুবী। এখানেই জন্মগ্রহণ করেন ১৯১১ সালে। ২০০০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তারিখে তিনি মারা যান। প্রতিবছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে (৭ ফাল্গুন) হাজারও ভক্তের সমাগম ঘটে এখানে। বলা হয়ে থাকে, কুতুবদিয়ার নামকরণ হয়েছে কুতুব আউলিয়ার পূর্বপুরুষদের নামানুসারেই।

     

    বিস্তীর্ণ লবণ চাষের মাঠ

     

    দ্বীপ শীত মৌসুমে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে লবণ চাষ হয়।স্থানীয়রাই এখানে প্রাকৃতিক উপায়ে লবণ চাষ করে থাকেন। শিশু, বুড়ো, নারী সবার অক্লান্ত পরিশ্রমের বিচিত্র দৃশ্য অবলোকন করা যায় এখানে।

     

    কিভাবে যাবেন কুতুবদিয়া

     

    প্রথমত, ঢাকা থেকে বাসে চকরিয়া হয়ে যেতে পারেন।চকরিয়া থেকে সিএনজিতে মাগনামা ঘাট। মাগনামা ঘাট থেকে স্পীড বোট/ট্রলারে কুতুবদিয়া।

    এছাড়াও, আরেক উপায়ে বেশ নির্ঝঞ্জাটভাবে কুতুবদিয়া যেতে পারেন। এজন্য বাংলাদেশের যেকোনো স্থান থেকে নির্দিষ্ট ভাড়ায় বাসে বা ট্রেনে করে চট্রগ্রাম যেতে হবে। চট্রগ্রাম হতে বাসে কক্সবাজার যাওয়ার পর সেখান বড়ইতলী মোড় থেকে সিএনজি চালিত বেবিটেক্সিতে যেতে হবে মাগনামা ঘাট। জনপ্রতি ভাড়া ৩৫ টাকা। রিজার্ভ নিলে ২শ’ টাকা। মাগনামা ঘাট থেকে কুতুবদিয়া চ্যানেল পার হতে হবে ইঞ্জিন নৌকা অথবা স্পিড বোটে। ইঞ্জিন নৌকায় সময় লাগে ২০ থেকে ২৫ মিনিট, ভাড়া ১৫ থেকে ২০ টাকা। আর স্পিডবোটে লাগে ১০ মিনিট, ভাড়া ৬০ টাকা। চ্যানেল পার হলেই কুতুবদিয়া।

    বড়ঘোপ বাজার রিকশায় যেতে লাগবে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। এছাড়া চট্টগ্রামের তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে ও কক্সবাজার বাসস্টান্ড থেকে সরাসরি এস আলমের বাস যায় মাগনামা ঘাটে। ভাড়া চট্টগ্রাম থেকে ১৬০ টাকা, কক্সবাজার থেকে ৯০ টাকা।
     

    কোথায় থাকবেন

     

    দুইদিন একরাতের জন্য কুতুবদিয়া ভ্রমণ পরিকল্পনা সেরা। কুতুবদিয়া দ্বীপে পর্যটকদের থাকার জন্য মানসম্মত একমাত্র আবাসন ব্যবস্থা হল হোটেল সমুদ্র বিলাস। সমুদ্র লাগোয়া এই হোটেলে বসে উপভোগ করা যায় সমুদ্রের অপার সৌন্দর্য। হোটেলের দুই জনের নন এসি কক্ষ ভাড়া ৮শ’ টাকা তিনজনের ১ হাজার এবং চার জনের কক্ষ ভাড়া ১ হাজার ২শ’ টাকা। যদিও সিজন ভেদে এই ভাড়া বাড়তে কমতে পারে।

    তাছাড়া ক্যাম্পিং করেও এই দ্বীপে থাকা যায়। এজন্য গুনতে হবে না কোনো টাকা। আতিথেয়তার জন্য বিখ্যাত এই দ্বীপের লোকজন, তাই আলাদা সুবিধা পাবেন তাদের পক্ষ থেকে।
     

    কোথায় খাবেন

     


    এখানে রেস্টুরেন্টের সংখ্যা খুবই কম। তাই খাবারের জন্য কুতুবদিয়ায় বিশেষ কিছু পাবেন না। এখানে পাবেন দেশীয় খাবার যেমন; ভাত, বিভিন্ন রকম ভর্তা, শুঁটকি আর মাছ-মাংস। তাজা খাবার খেয়ে আপনার মন থাকবে উৎফুল্ল।

     

    ভ্রমণ টিপস

     

    • মনে রাখবেন দ্বীপে জেনারেটর ও সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে চাহিদা মেটানো হয়, তাই ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস বেশি নেয়া অযৌক্তিক।
    • এই দ্বীপের সৈকতে জোয়ার ভাটা চিহ্নিত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই নিজ দায়িত্বে জোয়ার-ভাটার সময় জেনে সমুদ্র স্নানে নামতে। ভাটার সময় সমুদ্রে নামবেন না।
    • নৌকা ও স্পিডবোট চলাচলের সময় ঘাটে জিজ্ঞেস করে নিবেন।
    • সৈকতে পরিবেশ দূষণ করবেন না।
    • আপনার ভ্রমণ আনন্দদায়ক হোক।

    /

    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    শনি
    রোব
    সোম
    মঙ্গল
    বুধ
    বৃহ
    শুক্র

    সম্পাদক: দিদারুল ইসলাম
    প্রকাশক: আজিজুর রহমান মোল্লা
    মোবাইল নাম্বার: 01711121726
    Email: bartajogot24@gmail.com & info@bartajogot24.com