• বৃহস্পতিবার, ৬ মে ২০২১ , ২৩ বৈশাখ ১৪২৮
  • আর্কাইভ

বৃহস্পতিবার, ৬ মে ২০২১ , ২৩ বৈশাখ ১৪২৮

আজ শ্রমিক দিবস

ফারজানা জান্নাত
প্রকাশিত :শনিবার, মে ১, ২০২১, ১১:২৬

  • আজ পহেলা মে, মহান মে দিবস। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশের এক ঐতিহাসিক গৌরবময় দিন।

    হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,


    পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,

    তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,

    তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;

    তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,

    তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!

     

    'শ্রম' ও 'শ্রমিক' শব্দ দুটির মনে পড়লেই নজরুলের এই কবিতাটি চোখে ভেসে উঠে। তেমনি কবি প্রেমেন্দ মিত্র দুর্জয় শ্রমশক্তির জয়যাত্রা ও তার মহৎ কার্যকলাপের অমৃত রূপ প্রত্যক্ষ করে বলেছেন-

    "আমি কবি যত কামারের - যত ইতরের।"

     

    পৃথিবী বিশাল কর্মক্ষেত্র। কালিক পরিক্রমার বিবর্তনের নানা স্তর পেরিয়ে আধুনিক বিশ্বসভ্যতা যে ঐশ্বর্যময় রূপ পরিগ্রহ করেছে, তা সম্মিলিত পরিশ্রমের ফসল। শ্রম মানব সভ্যতার সৌধকিরীটির অনবদ্য উপাচার। 

     

    আজ পহেলা মে, মহান মে দিবস। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশের এক ঐতিহাসিক গৌরবময় দিন। সভ্যতা বিনির্মাণে কারিগর তথা বিশ্ব শ্রমিকশ্রেণীর সমন্বিত উৎসবের দিন। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে প্রেরণা দানকারী এই দিনটি সারা বিশ্বের শ্রমিকসমাজের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন।

     

    শ্রমিক দিবসের প্রেক্ষাপট :

     

    বিশ্ব মানবসভ্যতায় শ্রমিকশ্রণি বরাবরই অধিকার বঞ্চিত। বিশেষত প্রাশ্চাত্যের শিল্পোন্নত দেশগুলোতে শিল্পশ্রমিকদের যাপন করতে হতো মানবেতর জীবন। তারা ছিল মূলত শ্রমদাস। বিরামহীন, বিশ্রামহীন ও বিনোদনবঞ্চিত জীবন যাপিত করেছে। 

     

    উনিশ শতকের শেষে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে আমেরিকার শিকাগোর 'হে' মার্কেটে প্রবল আন্দোলন হয়। তখন শ্রমিকদের কাজ করতে হত দিনে ১৫ ঘণ্টা। ১৮৮৬-র ১ মে তাঁরা রাস্তায় নামেন দিনে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে। তিন লাখ শ্রমজীবী সেখানে অংশ নেয়। আন্দোলনরত ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের উপর পুলিশ এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণ করে। সে সময় পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়, ১০০-র ওপর আহত হন। পরে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় গ্রেপ্তারকৃত ছয় শ্রমিককে৷ কারাগারে বন্দিদশায় এক শ্রমিক নেতা আত্মহত্যাও করেন৷ পরের বছর প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে দিনটিকে মে দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়৷

    ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সের প্যারিসে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে শিকাগোর শ্রমিকদের সংগ্রামী ঐক্যের অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়ে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস ঘোষণা করা হয়।

    ১৮৯০ সাল থেকে সারাবিশ্বে শ্রমিক সংহতির আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে মে মাসের ১ তারিখে 'মে দিবস' পালিত হচ্ছে।

     

    'শ্রম' ও 'শ্রমিক' :

    ব্রোভো বলেছেন, "খোদার বিশ্বাসের পরেই আসে শ্রমের বিশ্বাস।"

    একজন মানুষকে তার ভাগ্যের দ্বার উম্মোচনের জন্য প্রথম ধাপ হলো শ্রম। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব দৈহিক, মানসিক ও কৌশলগত শক্তি রয়েছে। এগুলি বিনিয়োগ করে কাজ করার নাম শ্রম। শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তি শ্রমিক। শ্রম নিয়ে আলেকজান্ডার ক্রুমেল বলেছেন, "শ্রম সভ্যতার ফল।"

     

     

    বাংলাদেশে শ্রমিক দিবস-

     

    এবারের মে দিবসের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস গোটা পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ সকল শ্রমজীবীদের জীবিকা চালানোর পথ বন্ধ হয়ে আছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সমগ্র দেশে চলছে লকডাউন। এর ফলে বন্ধ রয়েছে ছোট বড় সব কলকারখানা, অফিস,আদালত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই গতিমন্থর রয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। আমাদের দেশে পরিবারসহ প্রায় ৭ কোটি শ্রমজীবী মানুষ রয়েছে। গার্মেন্টস, নির্মাণ, রি-রোলিং, চিংড়ি চাষ, শিপ ব্রেকিং, চাতাল, সুতা, সিরামিক, প্লাস্টিকপ্রবাসী শ্রমিক, পাট, চা, চামড়া, পরিবহন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, রাবার, স্টিল, , রিকশা, গৃহশ্রমিকসহ প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মরত এসব শ্রমিক হলেন বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। তাঁদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে বৃদ্ধি পেয়েছে আমাদের দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার। করোনার এই মহা সংকটকালে অধিকাংশ আয়ের পথ বন্ধ। শ্রমিকদের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। রিকশাচালক, গাড়িচালক, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, দোকানদার, ফুটপাতের ছোট ব্যবসায়ী—এমন খেটে খাওয়া কর্মজীবীরা এখন ঘরবন্দী। সুদিন ফেরার প্রতি চোখ চেয়ে দিন গুনছেন তাঁরা। এইসব মানুষেরা এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে কাজে যেতে পারছেন না। তারপরও কিছুসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষেরা সংসার নামক সমরাঙ্গনের যোদ্ধা হয়ে বাইরে বেরোয় কাজে উদ্দেশ্য। কিন্তু করোনার আশংকাজনক বৃদ্ধি, সরকারী কঠোর নীতি ঠেলে কোনো কাজ করা সম্ভবপর হয়ে উঠছেনা। তাছাড়া সবকিছু বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে বসে আছেন দেশের লাখ লাখ দিন আনে দিন খান মানুষ। এসব মানুষ এখন বেঁচে থাকার যুদ্ধ করছেন প্রতিদিন। করোনার কারণে দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের সোয়া ৫ কোটি শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা আজ হুমকির মুখে পড়েছে। লকডাউনের ফলে গণপরিবহন প্রায় বন্ধ রয়েছে । এতে লাখ লাখ পরিবহনশ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে নির্মাণশ্রমিকদের কাজ। বন্ধ রয়েছে ট্যানারি, শিপ ব্রেকিং, চিংড়ি, চাতাল, হোটেল রেস্টুরেন্টসহ সব অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের কাজ। পরিবার পরিজনসহ এসব সেক্টরের শ্রমিকেরা অর্ধাহারে, অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। গার্মেন্টস সেক্টরের জন্য কিছু প্রণোদনা প্রদান করলেও পরিবহন, নির্মাণ, ট্যানারি, চিংড়ি, শিপ ব্রেকিং, চাতাল, হোটেল রেস্টুরেন্টসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত পুরোপুরিভাবে বন্ধ থাকলেও তাঁদের বেতন-ভাতা ও জীবন জীবিকার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে তাদের বেঁচে থাকাই হয়ে উঠেছে কঠিন।

    বাংলাদেশে শ্রমিকদের অবস্থান : 

     

    শিকাগোর মর্মান্তিক প্রাণহানির প্রায় সোয়াশো বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু বাংলাদেশের শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি, নিরাপদ হয়নি কর্মক্ষেত্র। শ্রমিক-কর্মচারীরা আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ (যা বাংলাদেশ সরকার অনুসমর্থন করেছেন) অনুযায়ী তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। আটঘন্টার পরিবর্তে কোনো ওভারটাইম ছাড়া কাজ করানো হচ্ছে ১২-১৪ ঘন্টা। শ্রমঘন্টা এখন মালিকপ্রভুর ওপর নির্ভরশীল। তৈরী পোশাক, চামড়া কারখানাসহ ছোট বড় নানা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রচলিত শ্রমআইন অনুযায়ী স্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের পরিবর্তে সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে কাজ করানে হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে মালিক, শ্রমিক ও সরকারের প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত মজুরি বোর্ডের ঘোষিত নূন্যতম মজুরি দেওয়া হয়না। 

    একের পর এক দূর্ঘটনায় পোশাকশিল্পের শ্রমিকরা প্রাণ হারাচ্ছে, অঙ্গ প্রতঙ্গ হারিয়ে পঙ্গুত্বকে বরণ করে নিচ্ছে, জীবিকাহীন হয়ে পড়ছে। 

    মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “মহান মে দিবস শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অবিস্মরণীয় দিন। এ দিবস উপলক্ষে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল মেহনতি মানুষের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করছি।”

    প্রতিবছর শ্রমদিবসে আমাদের স্মরণ করা উচিত যে, এদেশের শ্রমিকরা মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, মানুষের মতো সদাচরণ পাওয়া - শ্রমিকরা এসব মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এদেশের তৈরী পোশাকশিল্প সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী খাত হিসেবে উজ্জ্বল, এ শিল্পের শ্রমিকরা ততটাই নিষ্প্রভ।

     

    ফারজানা জান্নাত


    শিক্ষার্থী

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

     

    /আবুল বাশার

    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    শনি
    রোব
    সোম
    মঙ্গল
    বুধ
    বৃহ
    শুক্র

    সম্পাদক: দিদারুল ইসলাম
    প্রকাশক: আজিজুর রহমান মোল্লা
    মোবাইল নাম্বার: 01711121726
    Email: bartajogot24@gmail.com & info@bartajogot24.com