• বৃহস্পতিবার, ৬ মে ২০২১ , ২৩ বৈশাখ ১৪২৮
  • আর্কাইভ

বৃহস্পতিবার, ৬ মে ২০২১ , ২৩ বৈশাখ ১৪২৮

হযরতের আধ্যাত্মিক প্রভাবে একরাতে মক্কা শরীফ হইতে চট্টগ্রাম শহরে হাজ্বীর প্রত্যাবর্তন

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক:
প্রকাশিত :মঙ্গলবার, মে ৪, ২০২১, ০৫:০৭

  • মাইজভান্ডারি দরবার শরিফ

    চট্টগ্রাম, নানুপুর নিবাসী সৈয়দ খায়ের উদ্দিন ডাক্তার সাহেবের একজন বন্ধু, কাবা শরীফে হজ্ব করিতে গিয়াছিল। হজ্ব সমাপন করিয়া হাজ্বীগন বাড়িতে ফিরিতে লাগিলেন। কিন্তু তিনি,টাকা পয়সা খরচ হইয়া যাওয়ায় বাড়িতে ফিরিতে অসমর্থ হইয়া চিন্তিতভাবে তথায় অবস্থান করিতে লাগিলেন। সঙ্গী হাজ্বীগন হইতে সাহায্যের চেষ্টা করিয়াও বিফল মনোরথ হন। অবশেষে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া ক্ষুধা তৃষ্ণায় বিশেষ কাতর হইয়া পড়িলেন। তিনি আরবি ভাষা না জানায় মনের ভাব কাহারো নিকট ব্যক্ত করিতেও অপারগ। অবশেষে তিনি বোকার মত ভিক্ষাবৃত্তি আরম্ভ করিয়া দিলেন। অসীম কষ্টে তাহার স্বাস্থ্য নষ্ট হইয়া গেল। তিনি বিপদতারণ মহাপ্রভুর স্বরণ লইলেন। তিনি বিশেষ মিনতির সহিত খোদাতায়ালার নিকট প্রার্থনা জানাইলেন, হে করুণাময়! বিশ্বে যদি তোমার কোন মাহবুব থাকেন, জামানার দূঃখ নিবারক ক্ষমতাবান তোমার কোন প্রিয় বন্ধু যদি জগতে থাকেন,তবে তাহার উছিলায় তুমি আমাকে এই বিপদ হইতে উদ্ধার কর। আমাকে দেশে ফিরিবার উপায় করিয়া দাও। তুমি ছাড়া আমার আর কোন গতি নাই। প্রভু হপ! তোমার প্রিয় হাবিব নবীর রওজা মোবারকে জেয়ারত করিতে আসিয়া এবং তোমার পবিত্র কাবাগৃহ তাওয়াফ করিতে আসিয়া যদি কোন ভুলত্রুটি করিয়া থাকি, প্রভু তাহা ক্ষমা কর। আল্লাহতালা তাহার প্রার্থনা কবুল করিলেন। পরদিন সন্ধ্যায় তিনি নির্জনে ঘুরিতেছিলেন, এমন সময় মাইজভাণ্ডারী মাওলানা জনাব হযরত আহমদ উল্লাহ (কঃ) সাহেবকে তাঁহার সম্মুখে দেখিতে পাইলেন। তিনি অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত এবং আহলাদিত হইলেন। পলকে যেন তাঁহার শক্তি শতগুণ বাড়িয়া গেল। তছলিমাত জানাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন -হুজুর আপনি কখন মক্কা শরীফে আসিয়াছেন? "উত্তরে তিনি বলিলেন যে তিনি হজ্বের পূর্ব আসিয়াছেন। আমার শোচনীয় অবস্থা দর্শনে তিনি মর্মাহত হইলেন এবং সঙ্গী হাজ্বীগনের সহিত চলিয়া না যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি অকপটে আমার দূরাবস্থার কথা তাহার নিকট ব্যক্ত করিলাম। তিনি আমার প্রতি দয়াদ্র দৃষ্টিতে তাকাইয়া বলিলেন, " ভাই সাহেব। আর কোন চিন্তা নাই আমার সাথে আসুন। আল্লাহতালা আপনাকে নিরাপদে বাড়িতে পৌছাইয়া দিবেন।" এই কথা বলিয়া তিনি পথ চলিতে লাগিলেন। আমিও আনন্দিত মনে তাহার পিছনে চলিতে আরম্ভ করিলাম। মাগরিবের নামাজের সময় হইলে দুইজনে এক নির্জন স্থানে নামাজ সমাধা করিয়া লইলাম। তিনি একটি থলিয়া হইতে আমাকে কিছু মেওয়া ও পানীয় দিলেন। আমি ক্ষুধা তৃষ্ণা নিবারণ করিলাম। সন্ধ্যার অন্ধকার তখন ঘনীভূত হইয়া আসিয়াছে। তিনি তলিয়া হইতে একটি মোমবাতি বাহির করিয়া জ্বালাইলেন এবং বাতিটি আমার হাতে দিয়া বলিলেন, " আপনার দৃষ্টি সম্মুখ দিকে করুন।" আমি সম্মুখপানে তাকাইয়া দেখিলাম অদূরে একটি প্রদীপের অত্যুজ্জ্বল আলো জ্বলিতেছে। উহার আলোক রশ্মি যেন আমার মুখপানে ধাইয়া আসিতেছে। আমি একটি উজ্জ্বল প্রদীপ দেখিতেছি বলিয়া জানাইলাম। তিনি আমাকে একটি "ইছম" শিখাইয়া দিয়া বলিলেন, "ভাই সাহেব আপনি ইছম খানা পড়িতে পড়িতে একধ্যানে দ্রুত ঐ প্রদীপটির দিকে অগ্রসর হউন। এ'দিক ও'দিক থাকাবেননা। কথামত কাজ করিলে আল্লাহ অতি সত্বর আপনাকে দেশে পৌঁছাইবেন। দেশে পৌঁছিয়া এ সমস্ত কথা কাহারো নিকট প্রকাশ করিবেননা।" আমি তাঁহার আদেশ শিরোধার্য করিয়া "ইছম" খানা জপিতে জপিতে প্রদীপটির দিকে একাগ্রচিত্তে মন্ত্রমুগ্ধবৎ চলিতে লাগিলাম। কতক্ষণ চলিয়া হঠাৎ আমি মন্ত্রখানা ভুলিয়া গেলাম এবং সামনের উজ্জ্বল প্রদীপটিও অদৃশ্য হইয়া গেল। ইহাতে আমি বিপদ মনে করিয়া অতিশয় ভীত হইয়া পড়িলাম। এদিক-ওদিক তাকাতে দেখিতে পাইলাম, আমি চট্টগ্রাম শহরের সদরঘাটে। বাউটা লাকড়ী নামক স্থানে আসিয়া পৌঁছিয়াছি। তখন সময় সুবেহ সাদেক। চারিদিকে লোকজন চলাফেরা করিতেছে। আমি বিস্ময়ে অবাক হইয়া ভাবিতে লাগিলাম, এইমাত্র যেন পথচলা আরম্ভ করিলাম, কখন রাত শেষ হইল এবং কেমন করিয়া আমি চট্টগ্রাম পৌঁছিলাম। কি অদ্ভুত কান্ড! একি কেরামত।


    হযরত সাহেবের এই অপূর্ব আলৌকিক শক্তি, অদ্ভুত ও অবর্ণনীয় কেরামত এবং স্বদেশীয় লোকের প্রতি অযাচিত, অপ্রত্যাশিত এবং অসীম অনুগ্রহ, প্রত্যক্ষ দর্শনে আমি যেন আনন্দকুল হইয়া খোদার শোকরিয়া ও তাঁহার স্বরণে ভক্তি গদগদ কন্ঠে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিতে লাগিলাম এবং কেমন করিয়া তাঁহার দরবারে পৌঁছিয়া তাঁহাকে কদমবুসি দিব এবং তাঁহার অবস্থা অবলোকন করিব ইহাতেই আমি ব্যাকুল হইয়া পড়িলাম। আমার বিশ্বাস মাওলানা সাহেব হজ্বে যান নাই,গেলে আমি দেশে থাকিতে নিশ্চয় শুনিতাম। তিনি আমাকে উদ্ধার করিবার জন্যই এই আলৌকিক লীলা প্রদর্শন করিয়াছেন। তিনি নিশ্চয় বাড়িতে আছেন। এই সমস্ত কল্পনা করিতে করিতে আমি তখন বাড়ির প্রতি নহে, মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ পানে রওয়ানা হইলাম। তখন আমার কিছুই ভাল লাগিতেছিল না। দিবা দুইটার সময় আমি দরবার শরীফে উপস্থিত হইয়া খবর নিয়া জানিলাম, তিনি ইতিমধ্যে কোথাও যান নাই। আমার অনুমান সত্য। সমস্তই তাঁহার কেরামত। আমি আত্নহারা পতঙ্গের মত তাঁহার পবিত্র চরণে লুটাইয়া পড়িয়া আনন্দাশ্রুতে তাঁহার পদযুগল ভাসাইয়া দিলাম।


    আমার মাথায় করুণামাখা হাত ফিরাইয়া বলিতে লাগিলেন, " হাজ্বী সাহেব ওয়াদ ঠিক রাখিবেন। কোন কষ্ট হয় নাই তো"? আমি আরজ করিলাম "হুজুর! আমাকে যাহা শিখাইয়া দিয়াছিলেন তাহা আমি ভুলিয়া গিয়াছি। দয়া করিয়া পুনরায় উহা আমাকে শিখাইয়া দেন। তিনি উত্তর করিলেন, " আর দরকার নাই। আপনার কাজ তো সারিয়া গিয়াছে। আবার কেন?" এই বলিয়া খাদেমগনকে বলিলেন, "এই লোকটি বহুদূর হইতে আসিয়াছেন,তিনি পথশ্রমে ক্ষুধা তৃষ্ণায় নিতান্ত কাতর হইয়া পড়িয়াছেন,পানাহারে পরিতৃপ্ত কর"। খাদেম সাহেব আদেশ পাইয়া আমাকে তৃপ্তির সহিত খাওয়াইতে ও বসিতে দিলেন এবং নানাভাবে প্রশ্ন করিতে লাগিলেন। আমি প্রকৃত ঘটনা গোপন করিয়া অতি সতর্কতার সহিত তাদের প্রশ্নের জবাব দিলাম এবং মক্কা শরীফ হইতে অদ্যই কোন দয়ালু পরোপকারী অনুগ্রহে আসিয়াছি বলিয়া জানাইলাম। তাহাদের সহিত বেশি আলাপ না করিয়া পুনঃ হযরতের খেদমতে গেলাম। তিনি আমাকে অতি স্নেহভরে বলিলেন, " আপনি নিজ বাড়িতে চলিয়া যান। আপনার জন্য আপনার আত্মীয় স্বজনেরা ব্যাকুল হইয়া রহিয়াছে। আমি তাঁহার পাক চরণে ভক্তিপূর্ণ করিয়া তাঁহার আদেশমত বাড়ির প্রতি রওয়ানা হইলাম। বাড়িতে পৌঁছিলে সকলেই আমাকে দেখিয়া যেন অপ্রত্যাশিত ধন লাভ করিল। তাঁহাদের হৃদয়ে যেন নিরাশার অন্ধকারে আলোকরশ্মি দেখা দিল। আমি যে দেশে ফিরিয়া আসিব সেই আশা তাহারা একেবারেই ত্যাগ করিায়ছিল। এখন তাঁহারা আনন্দ উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। সকলেই প্রশ্ন করিতে লাগিল আমি কেমন করিয়া বাড়ি আসিলাম। আমি হজরতের কথা গোপন রাখিয়া এক কথাতেই উত্তর করিতে লাগিলাম যে একজন মহৎ ধর্মপ্রাণ বাদশাতুল্য ব্যক্তিই আমাকে বাড়ি আসিবার বন্দোবস্ত করিয়া দিয়াছেন। আজ পর্যন্ত হযরত কেবলা কাবার এই অপূর্ব কেরামত আমি কাহারো নিকট প্রকাশ করি নাই। এইমাত্র প্রথমেই আপনার নিকট প্রকাশ করিলাম।

    নানুপুর নিবাসী ডাক্তার খায়ের উদ্দিন সাহেব বলেন বক্তপুর নিবাসী আবদুল জলিল গোমস্তার সহিত একদিন হযরত সম্বন্ধে আমার আলাপ হয়। তিনি আমাকে বলেন- " আমার এক অন্তরঙ্গ বন্ধু হাজ্বী সাহেব, সদা সর্বদা আমাকে ডাকিয়া বলিতেন, ভাই আপনার সঙ্গে আমার নেহায়েত এক গুরুত্বপূর্ণ আলাপ আছে, যাহা এখন বলিতে অক্ষম। আমার মৃত্যুকালীন অবস্থায় আপনাকে বলিতে পারিব। আমাকে স্বরণ করাইয়া দিবেন যাহাতে না বলিয়া মৃত্যুবরণ না করি। নচেৎ ইসলাম ধর্মের এক বড় রহস্য গোপন থাকিয়া যাইবে। " বহুদিন পর পরে তাঁহার অবস্থা শোচনীয় হইয়া পড়িল। তাঁহার মৃত্যুবরণ দেখিয়া তাঁহার নিকট গোমস্তা সাহেব গেলেন। বন্ধুর মৃত্যুকালীন গোপন রহস্য জানিতে তিনি ব্যাকুল ছিলেন। বন্ধু হাজ্বী সাহেব বলিলেন "ভাই সাহেব আমিতো আপনার অপেক্ষাতেই ছিলাম। সময় বোধহয় আর বেশি নাই। অদ্যই আমি আপনাকে আমার গোপন কথাটি জানাইব। " তিনি কোন অংশ গোপন না রাখিয়া সবিস্তারে হযরত আকদাছের উপরোক্ত কারামতটি আমার নিকট বর্ণনা করিলেন এবং বলিলেন ভাই সাহেব! এই কথাটি গোপন রাখিতে হযরত আমাকে অঙ্গীকার করাইয়াছিলেন। এতদিন আমি গোপন রাখিয়াছিলাম। আমার মৃত্যুকালেও এই রহস্যটি গোপন থাকিলে লোকে তাঁহার পরিচয় পাইতে কষ্ট হইবে বিধায়,অদ্য আপনার নিকট ব্যক্ত করিলাম আপনি এই কেরামত খানা কাহারো নিকট প্রকাশ করিলেও আমার নামটি গোপন রাখিবেন।



    তথ্যসূত্রঃ গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর জীবনী ও কেরামত গ্রন্থ।
    ২৭ তম সংস্করণ-জানুয়ারি-২০১৮।
    ৯৪,৯৫,৯৬ পৃষ্ঠা।


    /

    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    শনি
    রোব
    সোম
    মঙ্গল
    বুধ
    বৃহ
    শুক্র

    সম্পাদক: দিদারুল ইসলাম
    প্রকাশক: আজিজুর রহমান মোল্লা
    মোবাইল নাম্বার: 01711121726
    Email: bartajogot24@gmail.com & info@bartajogot24.com