• শুক্রবার, ২৫ জুন ২০২১ , ১০ আষাঢ় ১৪২৮
  • আর্কাইভ

শুক্রবার, ২৫ জুন ২০২১ , ১০ আষাঢ় ১৪২৮

সেদিন যেভাবে লুন্ঠিত হয়েছিল বাংলার ধনভাণ্ডার

সায়ন গুপ্ত
প্রকাশিত :বৃহস্পতিবার, মে ৬, ২০২১, ০৪:২৫

  • পলাশীর যুদ্ধ

    পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নবাব সিরাজ উদ দৌল্লা পালিয়ে যাওয়া ও ধরা পড়ার অন্তর্বর্তী সময়ে মুর্শিদাবাদে ঠিক কী ঘটেছিল? কোথায় গেল নবাবের কোটি টাকার রত্ন ভান্ডার? খোঁজ নিতে গেলে ইতিহাসের পাতায় ডুব দিতেই হবে। আসুন আপনাদের নিয়ে যাই ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর প্রান্তরে, যেখানে রচিত হয়েছিল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।


    গোড়া ও তেলেঙ্গি সৈন্যদের সাঁড়াশি আক্রমণের চাপে কার্যত দিশেহারা সিরাজ প্রাণ বাচাতে উটের পিঠে চেপে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালান এবং সেই দৃশ্য আমবাগান থেকে তাড়িয়ে-তাড়িয়ে উপভোগ করেন লর্ড ক্লাইভ। যুদ্ধশেষে ক্লাইভের কাছে মিরজাফরের চিঠি আসে। চিঠির উত্তরে ক্লাইভ জানান 'কাল দুপুরে দাতপুরে দেখা হবে'। এরই মধ্যে প্রচার হয়ে যায় যে যুদ্ধ জয়ের জন্য গোড়া ও তেলেঙ্গি সৈন্যদের পুরস্কৃত করা হবে। মীরজাফর সেই রাতেই সৈন্য সমেত দাতপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ইতিমধ্যেই ক্লাইভ মেজর আয়ার্কুটকে সিরাজের পিছু নেওয়ার নির্দেশ দেন।

    পরের দিন ২৪শে জুন সকালে নবাব রাজধানীতে পৌঁছান। তিনি সেনাধ্যক্ষদের তাঁর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাজধানিতেই থাকার নির্দেশ দেন। কিন্তু কেউ তার কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেনি। তাই যখন নবাব শহরে এসে সৈন্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, তখন অপরপ্রান্তে দাতপুরে মিরজাফরের সাথে লর্ড ক্লাইভের সাক্ষাৎ চলছে। হাতিতে চেপে মীরন ও অন্যান্য সঙ্গীদের নিয়ে মিরজাফর ইংরেজ শিবিরে আসতেই তাকে গার্ড অফ অনার দেয় ব্রিটিশরা। কর্ণেল ক্লাইভ তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরেন এবং তৎক্ষণাৎ বাংলা ও বিহারের নবাব নাজিম ও সুবেদার পদে ভূষিত করেন। আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হয় যে, পাখি হাত থেকে ফস্কে যাওয়ার আগেই তাকে খাঁচাবন্দি করতে হবে। দ্রুত রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার তোড়জোড় শুরু হল। লর্ড ক্লাইভের মনের অন্তরালে কোথাও একটা রাজকোষ লুন্ঠনের আশঙ্কা চলছিল। তাই বিজয়োৎসব ভুলে পত্রপাঠ রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওনা। ক্লাইভ সমস্ত ষড়যন্ত্রকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে একাধিক চিঠি লেখেন।

    ২৪শে জুন সারাদিন বহু চেষ্টা করেও নবাব সিরাজ সৈন্য সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হন। সকলেই খাজনাখানা থেকে নিজেদের প্রাপ্য টাকা নিয়ে সরে পরেছেন। নবাব লক্ষ লক্ষ টাকা ছড়ালেও কোনো কাজ হল না। আমির-ওমরাহ কেউ নবাবকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন না। এমনকি নবাবের শ্বশুরমশাই মিরাজ খাঁও তাঁর থেকে মুখ ফেরান। সেই সময়ের বাঙালি হিন্দুরা ঘটনাটিকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। একজনকে সরিয়ে অন্যজন সেই সিংহাসন আগলাবে, এই রীতি ভারতবর্ষে বহু প্রাচীন। আলিবর্দি খাঁ সরফরাজ খাঁকে সিংহাসনচ্যুত করে ক্ষমতায় আসেন। তার ১৭বছর পর তাঁর নাতি সিরাজকে সরিয়ে মসনদে বসেন তাঁর ভগ্নিপতি মিরমহম্মদ জাফর আলি খাঁ ওরফে মিরজাফর। এটাই তো স্বাভাবিক। সেই সময়ের মানুষদের মনে পরাধীনতা সম্বন্ধে কোনোরকম চেতনাবোধ জন্মায়নি। তাই পলাশীর যুদ্ধের ফলাফলকে সেকালের বাঙালীরা সেভাবে গুরুত্ব দিতে নারাজ ছিল। কিন্তু এই দিক থেকে দেখলে, মুসলমানদের মনে এই হারের বিরাট প্রভাব পরেছিল। তাদের রাজত্ব চলে যাওয়ায় মনে মনে বিক্ষুব্ধ হলেও ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস তারা দেখাতে পারেনি। অপরদিকে হিন্দুদের অনেকেই নবাবের উৎপীড়নের হাত থেকে নিস্তার পেয়ে মনে মনে যুদ্ধের এই ফলকে সাদরে সমর্থন করেছিল।

    পলাশীর যুদ্ধের আগেই বিহারের হিন্দুরাজ ও জমিদারদের একাংশ সিরাজের উপর বেজায় চটেছিল এবং তারা গোপনে মুসলিম উৎখাত করার ব্যাপারে বিশেষ পরিকল্পনা করছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই বাংলা ও বিহারের ব্যবসা-বাণিজ্যের অধিকাংশ হিন্দুদের হাতে থাকায় বিদেশি ব্যবসায়ীদের সাথে তাদের সদভাব ছিল। আর্থিক লেনদেনের স্বার্থে কেবল ব্রিটিশদের সাথেই নয়, ডাচ ও ফরাসিদের সাথেও খুব ভালো বোঝা পরা তৈরি হয়েছিল। তবে মুসলমানরা ব্যবসায় বিশেষ আগ্রহী ছিল না। তাই বিদেশি বণিকদের সাথে তাদের কোনোদিন সেভাবে সুসম্পর্ক তৈরিই হয়নি।


    গুপ্তচর মারফত গোড়া সৈন্যদের আসার খবর সিরাজ আগেই পেয়ে যায়। তাই সেই রাতে লুতফুন্নেসা ও আরও কয়েকজন বেগমকে নিয়ে দ্রুতগামী বলদের গাড়িতে চেপে রাজধানী ছাড়েন তিনি। সাথে প্রচুর ধনরত্নও নিয়ে রাখেন। পরিকল্পনা করেছিলেন যে রাজমহল হয়ে পাটনায় যাবেন এবং রাজা রামনারায়নের সহযোগিতায় বাংলা থেকে ইংরেজদের চিরতরে বিতারিত করবেন।

    এদিকে মিরজাফর মুর্শিদাবাদে আসার পথেই সিরাজের পালানোর খবর পান। ২৫শে জুন মুর্শিদাবাদ পৌছে নিজের জাফ্রাগঞ্জ প্রাসাদে না গিয়ে ওঠেন সিরাজের সাধের মন্সুরগঞ্জ প্রাসাদে। সিরাজের প্রাসাদে থেকে সিরাজকেই ধরে আনার জন্য চারিদিকে লোক পাঠান।

    পরের দিন লর্ড ক্লাইভ সৈন্যসমেত কাশিমবাজার হয়ে মুর্শিদাবাদের পথে মাদাপুরে উপস্থিত হন। সেখানে থাকাকালীন মহারাজ দুর্লভরাম দেওয়ান ক্লাইভকে জানান যে নবাবি কোষাগারে যে পরিমাণ অর্থ আছে তা দিয়ে পাওনা মেটানো সম্ভব নয়৷ ক্লাইভ এই অঘটনের আশঙ্কাই করেছিলেন। খবরটা পেয়ে তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। নবাবি মসনদে বসা মিরজাফরও দেখলেন কোষাগারে অর্থের টানাটানি। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ যা সঞ্চয় করে রেখেছিলেন তা বিলাসিতায় উড়িয়ে দিয়েছিলেন নবাব সুজাউদ্দিন ও সরফরাজ খাঁ। এরপর আলিবর্দি খাঁয়ের সময়ে যা সঞ্চিত অর্থ ছিল, তা বর্গী হাঙ্গামা মেটাতে খরচ হয়ে যায় আর যা পড়ে ছিল তা নবাব সিরাজ উদ্ দৌল্লা পালানোর সময় সৈন্য সংগ্রহের জন্য নয়-ছয় করেন।


    শত কাণ্ড করে পলাশীর যুদ্ধ জয় করার পর শেষে কিনা শূণ্য হাতে ফিরতে হবে! নবাবি ধনাগারে কী আছে তা পরীক্ষা করার জন্য ক্লাইভ নিজের সেক্রেটারি ওয়ালস লুসিংটন, মুন্সি নবকৃষ্ণ ও দেওয়ান রামচাদকে পাঠান। তবে কি নবাবি ধনাগারে কিছুই ছিল না! ছিল অনেক। তবে তা মিরজাফরের প্রতিশ্রুতি পূরণ করার মতো নয়। ওয়ালস ও তার সঙ্গীরা হিসেব দিলেন যে নবাবি ধনাগারে মোট ১কোটি ছিয়াত্তোর লক্ষ টাকা, ৩২লক্ষ মোহর, দুটি সিন্দুক ভরা সোনার পাত, চার সিন্দুক মণি মুক্ত এবং ২ সিন্দুক জহরতের গয়না আছে। কিন্তু মিরজাফরের অনুগতরা বেগম মহলের গুপ্ত ধনাগারের কথা ব্রিটিশ সাহেবদের থেকে গোপন করে রাখে। মিরজাফর ও তার বিশ্বস্তেরা রামচাদ ও নবকৃষ্ণকে সামান্য অর্থের লোভ দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছিলেন। তবে এটাও ঠিক যে নবাবি ধনাগার লুঠের সময় তারাও প্রচুর অর্থের ভাগিদার হয়েছিল।

    ব্রিটিশ কোম্পানিকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া অর্থের মাত্র অর্ধেক অর্থ সেই সময় কোষাগারে ছিল। বাকি অর্থ তিন বছরে সমান কিস্তিতে দেওয়ার চুক্তি হয়। কে, কত টাকা পাবে তা পলাশীর যুদ্ধের আগেই একটি গোপন দলিলে ঠিক করা ছিল। লর্ড ক্লাইভের নির্দেশে দুটি দলিল তৈরি হয়েছিল। একটি ছিল আসল ও অপরটি নকল। নকল দলিলের শর্ত অনুযায়ী ঊমিচাদকে দেওয়ার কথা ছিল ২লক্ষ সিক্কা টাকা। ভাগাভাগির সময় ঊমিচাদ জানতে পারেন এই নকল দলিলের কথা। একটা মুদ্রাও পায়নি ঊমিচাদ। এই একটি মাত্র লোক যে বিশ্বাসঘাতকতার ফল হাতে নাতে পায়।


    কোম্পানির কলকাতার কর্মচারিরা কে কত অর্থ নিয়েছিল, তা শুনলে চক্ষু চড়কগাছ হতেই হয়। গভর্নর ড্রেক পেয়েছিলেন ২লক্ষ ৮০হাজার টাকা। কর্নেল ক্লাইভ পেয়েছিলেন ২০লক্ষ ৮০হাজার টাকা, যার মধ্যে যুদ্ধে জেতার জন্য দান ছিল ১৬ লক্ষ টাকা। তার সেক্রেটরি ওয়ালস পেয়েছিলেন ১০লক্ষ ৪০হাজার টাকা এবং মেজর কিলপ্যাট্রিক পান ৫লক্ষ ৪০হাজার টাকা। এছাড়া সন্ধির শর্ত অনুযায়ী কোম্পানির প্রাপ্য অর্থ সাতশোটি সিন্ধুকে ভরে, একশোটি নৌকায় চাপিয়ে কলকাতায় পাঠানোর ব্যবস্থাও করে দিতে হয়।

    সামান্য কিছু অর্থে বিক্রি হয়ে যায় সিরাজের নিজেরই রক্তের প্রিয়জনেরা। নবাবি ধনাগার নি:শেষ করে কোম্পানির সাহেবরা সেদিন রঙিন জলের ফোয়ারা উড়িয়েছিল। স্বাধীন বাংলার অন্তিম পরিণতি দেখে বলা যেতেই পারে যে সেদিন অর্থই অনর্থের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

    সায়ন গুপ্ত 


    /

    ×
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    শনি
    রোব
    সোম
    মঙ্গল
    বুধ
    বৃহ
    শুক্র

    সম্পাদক: দিদারুল ইসলাম
    প্রকাশক: আজিজুর রহমান মোল্লা
    মোবাইল নাম্বার: 01711121726
    Email: bartajogot24@gmail.com & info@bartajogot24.com