• শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ , ৯ আশ্বিন ১৪২৮
  • আর্কাইভ

শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ , ৯ আশ্বিন ১৪২৮

ও হেনরি: পরিচিতি লুকিয়ে পরিচিতি গড়ার লড়াই

সায়ন গুপ্ত
প্রকাশিত :মঙ্গলবার, মে ১১, ২০২১, ০২:১১

উইলিয়াম সিডনি পর্টার

৩ বছর বয়সে মাতৃহারা হন। তার কয়েক বছরের মধ্যেই হারান পিতাকে। কাকু, কাকিমা ও ঠাকুমার কাছে বেড়ে ওঠা এই শিশুটির পরিচয় উইলিয়াম সিডনি পর্টার, যাকে গোটা বিশ্ব চেনে ও হেনরি নামে। বিশ্ববন্দিত এই মার্কিন সাহিত্যিকের জন্ম ১৮৬২ সালে, নর্থ ক্যারোলিনা প্রদেশের গ্রিসবোরো শহরে। ছোটবেলা থেকেই বই-পাগল ছেলেটিকে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়তে হয়। একমাত্র শিক্ষিকা ছিলেন ঠাকুমা। অভাবের সংসার। আয়ের মাধ্যম বলতে কাকুর একটি ছোট ওষুধের দোকান। মাত্র ১৭ বছর বয়সে, কাকুকে সাহায্য করার জন্য কাকুর ওষুধের দোকানে কাজ করা শুরু করেন। কর্মরত অবস্থায় সারাদিন নানান ক্রেতার সাথে মেলামেশার সুযোগ পান পর্টার। একসময়ে দোকানে আসা খরিদ্দারদের স্কেচ তৈরি করে তাদের দেখাতেও শুরু করেন তিনি। শিল্পকর্ম দেখে স্তম্ভিত ক্রেতাদের সকলের মুখে একটাই প্রশ্ন 'এত কম সময়ে এমন সুন্দর স্কেচ আঁকলে কি করে!' কিছুদিনের মধ্যে ফার্মাসিস্টের ডিগ্রিও পেয়ে যান তিনি।


১৮৮২ সালে হঠাৎই অবিরাম কাশির শিকার হন তিনি। কাশি সারাতে চলে আসেন টেক্সাসের অস্টিন শহরে। নতুন শহরে পর্টারের সাথে আলাপ হয় জোসেফ হেরলের। জোসেফ তাঁকে নিজের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। সেখানে তিনি তাঁর বাল্যকালের বন্ধু রিচার্ড হল-এর লা স্যালে কাউন্টিতে ভেড়া চড়ানোর কাজে হাত লাগান। কিছুদিন কাজ করার পর সেখানে মন না টেকায় এরপর হয়ে যান পাচক। পেরাম্বুরেটারে বাচ্চা বয়ে বেড়ানোর মতো কাজও করেন তিনি। এখানেই কর্মরত অবস্থায় পেশায় কৃষক এমন বেশ কয়েকজন জার্মান ও স্পেনীয় অভিবাসীদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পান পর্টার। অবসর সময়ে বিভিন্ন নতুন-নতুন বই পড়েন তিনি। এই জীবন অভিজ্ঞতা তাঁর মনের অন্তরালে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে।

কাজ শেষে পর্টার হামেশাই একদল নতুন বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে উঠতেন। বন্ধুদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তার কারণই ছিল তাঁর অসীম গল্পের ভান্ডার। প্রায়ই সেই বন্ধুরা তাঁর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ মিশ্রিত হাস্যরসে পূর্ণ গল্প শুনে টেবিল চাপড়াতেন। তাঁর বাজানো গিটার ও মেন্ডোলিনের সুর সকলকে মুগ্ধ করত। মাঝেমধ্যেই গির্জার তরুণ গায়কদলে ভিড়ে গিয়ে গানও গাইতেন। সেখানেই আলাপ হয় তাঁর জীবনসঙ্গী এথল ইস্টেটের সঙ্গে। এই সময় পর্টার বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও সংবাদপত্রে ফ্রিল্যান্স লেখক ও কার্টুনিস্ট হিসেবেও কাজ করছিলেন।

১৮৮৭ সালে পর্টারের প্রিয় মিত্র রিচার্ড হল টেক্সাসের ল্যাণ্ড কমিশনারের পদে উত্তীর্ণ হলে, তিনি পর্টারকে তার অধিনে ড্রাফটসম্যান হিসাবে কাজ করার সুযোগ করে দেন। বেতন বাবদ ১০০ ডলার ধার্য করা হয় যা তাঁর পরিবারের ভরণ পোষণের জন্য যথেষ্ট ছিল। তবুও তিনি বিভিন্ন ম্যাগাজিনে ফ্রিল্যান্স লেখকের কাজটি চালিয়ে যান। কিন্তু সেই বছরেই রাজনৈতিক ক্ষমতার হস্তান্তরের ফলে রিচার্ড চাকরিটি খোয়ান। তাই পর্টারও কাজ থেকে ইস্তফা দিয়ে দেন।


সৌভাগ্যবশত অস্টিনের প্রথম ন্যাশনাল ব্যাঙ্কে হিসাব নিয়ামক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। তবে এই কাজে তার কখনোই মন বসেনি। সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনের কাজেই ছিল তার সম্পূর্ণ ধ্যান-জ্ঞান। পর্টারের কাজের এই ঢিলামির সুযোগ নিয়েই ১৮৯৪ সালে তার এক সহকর্মী টাকা লেনদেনের হিসেবে গন্ডগোল করে বসে। খবরটি ম্যানেজারের কানে গেলে পর্টারকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

এই ঘটনার পরে পরিচিতদের একাংশের মনে হয়েছিল যে এবার হয়তো পর্টারের জীবন চোরাবালির টানে তলিয়ে যাবে। কিন্তু চাকরি খোয়ানো তার কাছে শাপে বর হল। সেই সময় থেকে পর্টার 'দ্য রোলিং স্টোন' নামের এক রসাত্মক সাপ্তাহিকের হয়ে কলাম লেখা ও স্কেচ তৈরির কাজে সম্পুর্ণরূপে মনোনিবেশ করেন। ব্যাঙ্কে কর্মরত অবস্থাতেই সাপ্তাহিকের কাজটি তিনি পান। সাপ্তাহিকটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাধারণ মানুষের জীবন ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক লেখা প্রকাশ করা হত। নেহাতই কম বেতন হওয়া সত্বেও এই কাজটিই ছিল তার মনের সবচেয়ে কাছের কাজ। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পর্যাপ্ত লাভের মুখ না দেখায় সাপ্তাহিকটির প্রকাশনার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। দ্য রোলিং স্টোন-এ পর্টারের লেখা গল্পগুলি ইতিমধ্যেই 'হিউস্টন পোস্ট' এর সম্পাদকের নজর কাড়ে। ১৮৯৫ সালে স্ত্রীকে নিয়ে তিনি হিউস্টনে চলে আসেন। সেখানে তিনি হিউস্টন পোস্ট-এর হয়ে মাত্র ২৫ ডলার বেতনের বিনিময়ে কাজ শুরু করেন।

হিউস্টনে থাকাকালীনই অস্টিনের ন্যাশানাল ব্যাঙ্কের তহবিল তছরুপের দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি সত্য প্রমাণিত হওয়ায় তিনি গ্রেপ্তার হন। প্রভাবশালী শ্বশুরমশাইয়ের সহযোগিতায় শীঘ্রই তিনি জামিন পান। তবে এই ঘটনা ঘটার কিছু দিনের মধ্যেই তিনি সেন্ট তছরুপের অভিযোগে পুনরায় গ্রেপ্তার হন ও কোর্ট তাঁকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। তবে পর্টারকে গড়াদের পিছনে একদিনও কাটাতে হয়নি। ফার্মাসিস্টের ডিগ্রি থাকায় সংশোধনাগারের হাসপাতালে তাঁকে রাতের ডাক্তারের কাজ দেওয়া হয়। হাসপাতালের একটি ঘরেই তিনি দিনযাপন করতেন।

অবিরাম প্রতিকুলতার মধ্যেও তার কলম থেমে থাকেনি। হাসপাতালে বসেই লিখে গেছেন একের পর এক মনোগ্রাহী ছোট গল্প। পরিচয় গোপন রাখার জন্যই বন্ধুরা তাঁর সেই সব লেখা গল্পগুলি একাধিক ছদ্মনামে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশ করতে থাকে। ম্যাক ক্লিউয়ের ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা বিখ্যাত গল্প 'হুইস্লিং ডিক'স ক্রিস্টমাস স্টকিংস' ও হেনরি ছদ্মনামে প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি আর ছদ্মনাম পাল্টাননি। শাস্তির মেয়াদকাল ৫ বছর হলেও সুব্যবহারের জন্য তাঁর ২ বছরের সাজা মকুব করে দেওয়া হয়। সংশোধনাগারে থাকাকালীনই খবর পান যে তাঁর রোগশয্যায় শায়িত স্ত্রী মারা গেছেন।


১৯০১ সালে মুক্তি পেয়ে তিনি পাড়ি দেন নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যেই। সেখানেই ছিল তার অধিকাংশ প্রকাশকের কার্যালয়। সাহিত্যিক হিসেব তাঁর জীবনের সেরা সময় শুরু হয় ১৯০২ সাল থেকে। ১৯০২-১৯০৭ সালের মধ্যে তিনি ৩৮১টি ছোট গল্প লিখে ফেলেন। অধিকাংশই হিট। পেশার সূত্র ধরে তাঁর সাথে আলাপ হয় বাল্যকালের বান্ধবী সারাহের। ১৯০৭ সালে দ্বিতীয় বারের জন্য সারাহের সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

গল্পের বিষয় ও চরিত্র খুঁজতে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন হোটেলের লবিতে ঘুরে বেরাতেন। সেখানে প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকা টুকরো টুকরো ঘটনাগুলিকে কাছ থেকে লক্ষ্য করতেন। পথচলতি মানুষদের সাথে মিশে গিয়ে তাদের জীবনের নানান ঘটনার গল্প শুনতেন। যার ফলে গল্পের চরিত্রগুলি পাঠকদের নিতান্তই আপন বলে মনে হত। পর্টারের লেখা গল্পগুলির স্থান ও সময় পাল্টে দিলেই মনে হবে যেন আমাদের চোখের সামনে অহরহ ঘটনাগুলি ঘটে চলেছে।


'দ্য গিফট অফ দ্য মাজি', 'দ্য কপ এন্ড দি অ্যানথেম' এর মতো প্রায় ৬০০টিরও অধিক জনপ্রিয় ছোট গল্পের মালিক পরিচিত ছিলেন গল্পের শেষে অকল্পনীয় পরিসমাপ্তি পাঠকদের উপহার দেওয়ার জন্য। গল্পের বিষয়বস্তু, শব্দের ঘোর-প্যাচ, সারল্য, দ্বন্দ, চরিত্রাংকন এবং চমকপ্রদ পরিসমাপ্তি ছিল তাঁর লেখার প্রতি পাঠকদের আকর্ষিত করার মূল মন্ত্র, যার দরুন সেই সমস্ত গল্প আজ, একবিংশ শতকে নানা দেশের নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠক্রমে জায়গা করে নিয়েছে।

শেষ জীবনে অত্যাধিক পানীয়-প্রীতি তাঁর হৃদযন্ত্রের নানান সমস্যা ডেকে আনে, যার দরুন ১৯১০ সালে চিরতরে নিথর হয়ে পড়েন এই বিশ্ববন্দিত সাহিত্যিক। যেভাবে পরিচিতি লুকিয়ে পরিচিতি গড়ার লড়াই তিনি করেছেন তা আজও তরুণ প্রজন্মের লেখক-লেখিকাদের উৎসাহিত করে।

সায়ন গুপ্ত 


/

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র

সম্পাদক: দিদারুল ইসলাম
প্রকাশক: আজিজুর রহমান মোল্লা
মোবাইল নাম্বার: 01711121726
Email: bartajogot24@gmail.com & info@bartajogot24.com