• শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ , ৯ আশ্বিন ১৪২৮
  • আর্কাইভ

শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ , ৯ আশ্বিন ১৪২৮

উইঘুর: রাষ্ট্র যাদের এতিম করেছে

বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক:
প্রকাশিত : রবিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২১, ০৬:৫৫

উইঘুর: রাষ্ট্র যাদের এতিম করেছে

সম্প্রতি ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘দি ইকোনোমিস্ট’ (অক্টোবর, ২০২০ সংখ্যা) ‘উইঘুরদের উপর নির্যাতন এবং মানবাধিকারে বিশ্ব-সংকট’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। উক্ত প্রতিবেদনে বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর এবং সভ্য দেশ হিসেবে পরিচিত চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে বসবাসকারী উইঘুর মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর রাষ্ট্র-পরিচালিত দমন-নিপীড়নের মর্মান্তিক বর্ণনা দেয়া হয়েছে, যা মানব-অনুভূতিকে স্পর্শ না করে পারে না। নিম্নে বাংলায় তার অনুবাদ দেয়া হলো:

চীনের বন্দীশবিরে গণ-অন্তরীণ, যা উইঘুর পারিবারিক জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। 

সপ্তাহের শুক্রবার জুমরাত দাউতের তিন সন্তানের জন্য এক ভীতিকর দিন। চীনের সর্ব পশ্চিমের প্রদেশ জিনজিয়াং এর আঞ্চলিক রাজধানী উরুমচী। সেখানকার স্কুলগুলোতে সরকারী প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়ে ছাত্রদের প্রশ্ন-বাণে জর্জরিত করেন। প্রশ্নকর্তাগণ ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের গৃহে কিভাবে জীবন-যাপন করে তার নানা রকম সূত্র খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা চালান। তাদের বাপ-মা গৃহে নামাজ পড়েন কি না, কিংবা ইসলামী কায়দায় সম্বোধন করেন কি না, কিংবা নবী মোহাম্মদ সম্পর্কে তাদের বলেন কি না ইত্যাদি তারা জানতে চান। তারা যদি এ ধরনের কোন তথ্য খুঁজে পান তবে তার পরিণতি হয় ‘ভকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে’ ঠাঁই।


শুনতে শ্রুতিমধুর হলেও এগুলো হলো আসলে চীন সরকারের বন্দী-শিবিরের নাম। 

মিসেস দাউত বলেন, তার মতো জাতিগত উইঘুরদের এভাবে সার্বক্ষণিক নজরে নজরে রাখা হচ্ছে। এর ফলে ছেলেমেয়েদেরকেও তাদের বাপ-মায়ের মতোই অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বরফ-জমানো শীতেই হোক, আর উত্তপ্ত গরমের মধ্যেই হোক ছেলেমেয়েদেরকে নিয়ে প্রত্যেক সোমবারে যেতে হয় তাদের আবাসস্থলের আঙ্গিনায় চীনের পতাকা-উত্তোলন প্রদর্শনের জন্য। এদিনে তাদেরকে স্কুলে যেতে হয় না। এখানে অংশগ্রহণকারী সবাইকে উৎফুল্ল দেখানোর জন্য সতর্ক থাকতে হয়। কেবলমাত্র কর্মকর্তাগণই কারো মাঝে অসন্তোষের চিহ্ন খেয়াল করেন না, প্রত্যেক পরিবারকেই প্রতিবেশী অন্য দশটি পরিবারের উপর নজর রাখতে এবং সন্দেহজনক কোন কিছু দেখতে পেলে তার নোট নিয়ে সংরক্ষিত বাক্সে ফেলতে হয়।

মিসেস দাউত বলেন যে, গত বছর তার ও তার তিন ছেলেমেয়ের আমেরিকায় (রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন) পালিয়ে যাবার পূর্বে নতুন এসব বন্দীশিবিরের একটিতে তিনি দু’মাস ছিলেন। ২০১৭ সাল থেকে সেখানে বিনা বিচারে দশ লক্ষের অধিক মানুষকে প্রেরণ করা হয়েছে।

তাদের বেশীরভাগই উইঘুর। তার অপরাধ ছিল এই যে, তার স্বামীর দেশ পাকিস্তান থেকে টেলিফোন কল এসেছিল, কয়েক বছর আগে তিনি পাকিস্তান ভ্রমণ করেছেন, একজন বিদেশীর নিকট থেকে অর্থ পেয়েছেন (একজন পারিবারিক বন্ধু যিনি চীনে বাস করেন) এবং আমেরিকার ভিসা প্রাপ্তি। তাকে একটি সেলে এমন গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল যে, ভিতরে ঘুমানোর সময় তাদেরকে কাত হয়ে ঘুমাতে হতো। তার সন্তানরা এমন ভীত হয়ে পড়ে যে, না জানি শুক্রবারের জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের মুখ ফসকে কোন ভুল কথা বের হলে তাকে আবার সেই শিবিরে যেতে হয়।

জিনজিয়াং প্রদেশে বিগত তিন বছর ধরে এ বন্দীদশা বা সরকার যাকে কাজের প্রশিক্ষণ বা ‘মৌলবাদ সংস্কার’ বলছে, সেসব থেকে যে ভীতিকর ঘটনা উদ্ঘাটিত হচ্ছে, তার প্রত্যেকটির বিবরণ যাচাই করে দেখা অসম্ভব। যে সকল বিদেশী সাংবাদিক এ অঞ্চলে সফরে আসেন, তাদেরকে প্রচন্ড নজরদারিত্বে রাখা হয়। যাদের সাথে তারা কথা বলার চেষ্টা করেন বা সাক্ষাৎকার নেন, তাদের উপর নেমে আসে ভয়ংকর বিপদ। তবু সরকারী দলিলাদি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে অত্যাচারের ভয়াবহ কাহিনি বের হয়ে আসছে। মিসেস দাউতের গল্প কেবল বিশ্বাসযোগ্যই নয়, এরূপ ঘটনা ঘটছে অন্যান্যদের ক্ষেত্রেও।

এ ঘটনা থেকে জানা যাচ্ছে কিভাবে উইঘুরদের মতো মানুষদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলা এবং তাদের ইসলামী বিশ্বাসকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা চলানো হচ্ছে। তাদেরকে বন্দীশিবিরে পাঠিয়ে জীবনে সীমাহীন দু:খ-কষ্ট বয়ে আনা হয়েছে। তাদের হাজার হাজার সন্তানের জীবন ধ্বংস ও নি:শেষ করে দেয়া হচ্ছে।    

এ প্রতিবেদনটি দক্ষিণ জিনজিয়াংয়ের পল্লী কমিউনিটিতে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের দ্বারা লিপিবদ্ধ তথ্যের উপর ভিত্তি করে প্রণীত হয়েছে। এখানে বহু উইঘুর বসবাস করেন। এসব তথ্য জনৈক জার্মান স্কলার মি. এড্রিয়ান জেনজ কর্তৃক ‘দি ইকোনোমিস্ট’ পত্রিকাকে সরবরাহ করা হয়েছে। উপগ্রহ চিত্র এবং সরকারী দলিলাদির ভিত্তিতে পরিচালিত গবেষণা এ সকল বন্দী-শিবির স্থাপনের উদ্দেশ্য ও বিস্তার প্রমাণের জন্য সহায়ক হয়েছে। অনলাইন নেটওয়ার্ক থেকে নথিসমূহ ডাউনলোড করা হয়েছে। দারিদ্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য গঠিত তাদের স্থানীয় সরকারের ওয়ার্ক গ্রুপ কর্তৃক উক্ত নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হয়।

নির্বাসিত উইঘুরদের নাম, পরিচয় ও তথ্যাদি গোপন রাখার শর্তে এ গল্পে তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। যাদের অনেকেই চীন থেকে পালিয়ে অন্য দেশে গিয়েছেন, তারা ভীত ছিলেন যে, তাদের এ সাক্ষাৎকার চীনে অবস্থানরত তাদের স্বজন ও পরিবারের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। যে সকল ছেলেমেয়ের বাপ-মাকে আটকে রাখা হয়েছে তাদের সম্পর্কে অতুষ্টিকর অফিসিয়াল পরিভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। বাপ-মায়ের যে কোন একজন বা উভয়কে নতুনভাবে গড়ে-তোলা বন্দী-শিবিরে আটক থাকার উপর ভিত্তি করে ছেলেমেয়েদের শ্রেণি-বিভাজন করা হয়েছে ‘ডানকুন’ বা একক-দুর্ভোগরত অথবা ‘শুয়াকুন’ বা দ্বৈত-দুর্ভোগরত। এটাকে তারা বলছে ‘ভকেশনাল ট্রেনিং ক্যাম্প’ বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। আসলে এটা হলো তাদের নিয়মিত বা বিশেষ ধরনের বন্দীশালা।

ইয়ারখন্ড কাশগড় অঞ্চলের একটি কাউন্টি বা জেলা। তাকলিমাকান মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এ জেলায় নয় লক্ষ লোকের বসবাস। তাদের মধ্যে মোটামুটিভাবে সাত থেকে বার বছরের এক লক্ষ ছেলেমেয়ে রয়েছে।

তারা এক থেকে ছয় গ্রেডে বিভক্ত ছাত্র-ছাত্রী। এদের মধ্যে সাড়ে নয় হাজারের অধিক ছেলেমেয়েকে একটি পয়েন্টে ‘একক-দুর্ভোগ’ ও ‘দ্বৈত-দুর্ভোগ’ ক্যাটাগরীতে রাখা হয়েছে (৮২২ জনকে ‘দ্বৈত-দুর্ভোগ’ ক্যাটাগরীতে)। কেবলমাত্র ১১ জন ব্যতীত তাদের সবাই ছিল উইঘুর ছেলেমেয়ে। ঐ এগারজন ছিল কাজাক বা তাজিক বংশোদ্ভূদ। ইয়ারখন্ডে এ দুটো মুসলিম প্রধান গ্রুপের সদস্য-সংখ্যা ১% এর কম। এখানে কোন একজন হ্যান (চীনা) শিশুর বাপ-মা অন্তরীণে নেই। এসব তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায় যে, জিনজিয়াং প্রদেশে বসবাসকারী ত্রিশ লক্ষ উইঘুরের মধ্যে আড়াই লক্ষ ছেলেমেয়ের বাপ-মায়ের যে কোন একজন অথবা উভয়কেই অন্তরীণে রাখা হয়েছে। ‘দি ইকোনোমিস্ট’ পত্রিকায় প্রকাশিত মি: জেনজ এর একটি নোট থেকে দেখা যায় যে, ২০১৯ সালের শেষ নাগাদ আট লক্ষ আশি হাজার পাঁচ শত ছেলেমেয়েকে বোর্ডিং সুবিধায় রাখা হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে এ সংখ্যা প্রায় তিন লক্ষ তিরাশি হাজার বেশী।


উইঘুর পরিবারগুলোর মধ্যে এ বিচ্ছিন্নতা এতো বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, স্থানীয় সরকার এসব ছেলেমেয়ের আবাসন ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছে। সবচেয়ে বেদনার বিষয় এই যে, তাদের অনেকেই বাপ-মাকে অন্তরীণে হারিয়ে ফেলছে। প্রকৃতপক্ষে, দলিল-দস্তাবেজ থেকে দেখা যায় যে, কিছু ‘দ্বৈত-দুর্ভোগ  শ্রেণির শিশুকে কতগুলো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয়েছে। এর অর্থ এই যে, এ সকল শিশুর বাপ-মা আর ইহজগতে নেই বা তাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গিয়েছেন।  সরকার দ্রুততার সাথে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে বোর্ডিং সুবিধায় রূপান্তরিত এবং উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা-বেষ্টনি দ্বারা সুরক্ষিত করছে। এমন কি প্রাক-কিন্ডারগার্টেনগুলোকেও বোর্ডিং সুবিধার উপযোগী করে নেয়া হচ্ছে। কেবল কয়েক মাস মাত্র বয়সের শিশুদেরকে এখানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। জিনজিয়াং এর বোর্ডিং স্কুলগুলোতে ডরমিটরীর ফ্লোর স্পেস ২০১৯ সালে ৩০ শতাংশের অধিক বৃদ্ধি করা হয়েছে। সেখানে চীনের অন্যত্র মোটের উপর ৫ শতাংশেরও কম বৃদ্ধি করা হয়েছে।

কাশগড় এবং প্রধানত উইঘুর অঞ্চলগুলোতে কর্তৃপক্ষ তৃতীয় গ্রেডের উপরের সকল ‘দুর্ভোগরত’  শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীকে এসব ¯কুলে প্রেরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। স্কুল কর্তৃপক্ষ বরাবর এসব ছেলেমেয়েকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কাশগড় স্থানীয় সরকার বলেছে যে, তাদের মনস্তাত্তি¡ক কাউন্সেলিং গ্রহণ করা উচিৎ। শিক্ষকগণকে অবশ্যই প্রতিশ্রুতির সাথে এসব ক্লিষ্ট ছেলেমেয়েকে দেখভাল করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনরূপ অবহেলা করা চলবে না। বাপ-মায়ের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার কারণে তাদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে যাতে নেতিবাচক কোন প্রভাব না পড়ে, তা দূরীভূত করার জন্য বলা হয়েছে।

এমন কি শিবির বা কারাগারে আটক বাপ-মায়ের কাছে পত্র লেখা বা ভিডিও পাঠানোর জন্যও উৎসাহিত করা হচ্ছে। মিসেস দাউত বলেন যে, বন্দী জীবনের শেষ দিকে বন্দীদের সাথে ভালো ব্যবহার করা এবং তাদের সাথে তাদের পরিবারকে লাইভ ভিডিও চ্যাট করার অনুমতি দেয়া হয়। তাদেরকে সাধারণ মানের পোশাক সরবরাহ করা এবং তাদেরকে তাদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ইতিবাচকভাবে বলার জন্য বলা হয়।

কিন্তু এমন কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ বিদ্যমান যন্ত্রণার কোন প্রতিকার নয়। গত বছর ছেলেমেয়েদের এই ভয়াবহ মানসিক সংকটের বিষয় কাশগড়ের একটি স্কুলের একজন চীনা শিক্ষকের লেখার মাধ্যমে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি একজন দীনহীন, নি:স্ব বালিকার কথা লিখেছেন। তার পিতাকে অন্তরীণে রাখা হয়েছে, আর মাকে রাখা হয়েছে দূরবর্তী একটি শহরে। সে সব সময় ক্ষুধায় কাতর, স্বল্প-বস্ত্র, বিমাতার দ্বারা প্রহৃত হয়ে থাকে। তিনি বলেন যে, স্কুলের বাইরে সাইরেন বেজে উঠলে ছাত্র-ছাত্রীরা জানালার কাছে ছুটে যায় এবং অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে দেখে যে, তাদের বাপ-মায়ের কোন একজনকে ধরে নিয়ে যায় কি না। এ ঘটনা প্রায়ই ঘটে।

ছেলেমেয়েদের স্কুল ত্যাগের পরই পারিবারিক জীবনের উপর চলতে থাকে নির্যাতন। যখন উইঘুর মেয়েরা বিবাহের উপযুক্ত হয় (চীনে আইন অনুযায়ী বিবাহের বয়স ২০ বৎসর), তখন কর্মকর্তাগণ মিষ্টি মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে হ্যান বা চীনা বংশোদ্ভূদ কাউকে বিবাহের জন্য তাদেরকে প্রলুব্ধ করতে থাকেন।

কেউ বিবাহে অস্বীকার করলে তার জন্য পরিবারের উপর নেমে আসে দুর্ভোগ। এমন কি চীনের অন্যত্র পরিবারের আকারের উপর সীমানা টানার ব্যাপারটি শিথিল করলেও জিনজিয়াং প্রদেশে এটাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কোন উইঘুর দম্পতির দুই এর অধিক বা তিন সন্তান হলে তাদেরকে জরিমানা বা তাদের উপর অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। এমন কি তারা পল্লী অঞ্চলে বাস করলেও। চীনের অন্য স্থানের চেয়ে উইঘুর মহিলাদের জন্মনিরোধক ডিভাইসের মূল্য অনেক অনেক বেশী ধার্য করা হয়-এসোসিয়েটেড প্রেস এর বরাত দিয়ে মি: জেনজ উল্লেখ করেছেন।

তিন সন্তানের জননীদের জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ করার সর্বাধিক ঝুঁকিতে থাকতে হয়। মিসেস দাউত বলেন যে, তাকে ২০১৮ সালে এমন চিকিৎসা নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। গত বছর জাতিসংঘ অফিসের পাশে অবস্থিত আমেরিকা সরকারের একটি প্যানেলে তার এ অগ্নিপরীক্ষার কথা বর্ণনা করার পর চীনের প্রচার মাধ্যমে মিসেস দাউতের ভাইয়ের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এখানে তার ভাই বলেন যে, তাকে (তার বোন) কোন ক্যাম্পে নেয়া হয় নি এবং বন্ধ্যাকরণ করাও হয়নি।

তিনি (মিসেস দাউত) বলেন যে, তিনি এটা প্রমাণ করতে ডাক্তারী পরীক্ষা করাতে ইচ্ছুক। তবে পরিসংখ্যান যা বলছে তাই-ই যথেষ্ট। জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুরদের জন্মহার ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। অফিসিয়াল তথ্য তাই বলছে। কাশগড় এবং পার্শ্ববর্তী হোতান অঞ্চলে ২০১৫ এবং ২০১৮ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ৬০ শতাংশের অধিক হ্রাস পেয়েছে।

কর্মকর্তাগণ পরিবারগুলোর উপর যে দুর্ভোগের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন সে ক্ষতির বিষয়ে সমালোচনাকে খন্ডনের জন্য তারা নানাভাবে চেষ্টা করে থাকেন। তারা বলছেন যে, তারা ছেলেমেয়েদেরকে তিনটি মন্দ কাজ থেকে রক্ষা করছেন। সেগুলো হলো সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও ধর্মীয় চরমপন্থা। তাদের প্রতি উত্তম সেবাযত্ন নেয়া হচ্ছে।

২০১৮ সালে রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র ‘জিনজিয়াং ডেইলী’ উল্লেখ করে যে, বন্দীশিবির প্রকল্পের স্থপতি ও জিনজিয়াং ডেপুটি পার্টি প্রধান ঝু হাইলুন হোতানের একটি ক্যাম্পে অবস্থিত ‘কাইন্ডনেস প্রি-স্কুল’ নামক একটি স্কুল পরিদর্শনে যান। তাঁকে বলা হয় যে, ছেলেমেয়েদের কারো কারো বয়স এক বছরের কম, সকলেরই বাপ-মা রয়েছেন, কিন্তু ‘নানা কারণে’ তারা তাদের ছেলেমেয়েদের দেখভাল করতে পারেন না। প্রতিবেদনে গর্বের সাথে উল্লেখ করা হয় যে, ছেলেমেয়েদের প্রয়োজনীয় সবকিছুই দেয়া হচ্ছে বিনামূল্যে, তাদের ওজন বাড়ছে, উচ্চতা বাড়ছে ও দ্রুত তারা ম্যান্ডারিন ভাষা শিখছে।

চীনের অন্যত্র যেমন, তেমনি জিনজিয়াং প্রদেশেও স্কুল থেকে সংখ্যা-লঘিষ্ঠদের জাতিগত ভাষা নির্মূল করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ নীতির বিরুদ্ধে উত্তরাঞ্চলের ইনার মঙ্গোলিয়াতে বাপ-মা কর্তৃক সম্প্রতি প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্যপূর্ণ লক্ষ্য হলো নন-হ্যান ছেলেমেয়েদের সফলতার আরও সুযোগ সৃষ্টি করা। এ জন্যে তাদেরকে ম্যান্ডারিন ভাষা শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেয়া, যাতে তাদের জন্য আরও বেশী বেশী চাকুরীর সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে এটা সংখ্যা-লঘিষ্ঠদের আত্ম-পরিচয়কেও মুছে ফেলার শামিল হবে। জিনজিয়াং কর্তৃপক্ষ সেই উদ্দেশ্য অর্জনে অত্যন্ত সক্রিয়।


উইঘুরদের ভাষা তুর্কী। তাদের আচার-আচরণ ও ধর্ম তিববতি বা জাতিগত মোঙ্গলদের চেয়ে চীনাদের নিকট অধিক অপরিচিত। কর্তৃপক্ষ এটাকে যেমনভাবে দেখছে (এমনকি তারা যদি এরূপ ঘোষণা করতে সতর্ক না হয়), তাতে জিনজিয়াং-এ বিচ্ছিন্নবাদকে দমন করতে একটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধের জন্ম দেবে।

এ শতাব্দীর শুরুর দিক পর্যন্ত উইঘুর-অধ্যূষিতএলাকার স্কুলগুলোতে সাধারণত জাতিগত উইঘুরদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হতো। তারা তাদের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে স্থানীয় ভাষায় শিক্ষা দিতেন। জিনজিয়াংয়ের একজন সাবেক শিক্ষাবিদ নির্যাতন এড়ানোর জন্য চীন থেকে পালিয়ে যান। তিনি বলেন যে, তার চলে আসার পূর্বেই স্কুলগুলোতে হ্যান-বংশোদ্ভূদ শিক্ষক নিয়োগ অবধারিত করা হয়েছিল। চাকুরীর বিজ্ঞপ্তিতে উইঘুরদের ম্যান্ডারিন ভাষা জানার দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয় এবং আবেদনকারীকে স্থনীয় বাসিন্দা হওয়ার কোন পারমিট প্রয়োজন আর থাকে না। তিনি বলেন, সেই সময়ে তিনি চীন ত্যাগ করেন।

শিক্ষাক্রম থেকে উইঘুর সাহিত্য কোর্সটি বাদ দেয়া হয়। বহু উইঘুর শিক্ষককে চাকুরী থেকে বহিষ্কার করা হয়। কাউকে কাউকে শিবিরে পাঠিয়ে দেয়া হয় (উইঘুর শিক্ষকদের অযোগ্য ঘোষণার সহজ একটি পদ্ধতি হলো ‘রাজনৈতিক তদন্ত চলছে। এটা নির্ধারণ করতে যে কারো সাথে কর্তৃপক্ষের কোন সমস্যা আছে কি না)।

২০১৭ সালে কাশগড়ের টোকজ্যাকে উপশহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘পরিপূর্ণ চীনাভাষী স্কুল পরিবেশ’ সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করে। মি: জেনজ কর্তৃক সংগৃহীত দলিলাদি বলছে যে, শিক্ষক বা ছাত্রদের দ্বারা উইঘুরদের যে কোন ব্যবহার ‘সিরিয়াস টিচিং ইনসিডেন্ট’ হিসেবে ধরে নেয়া হবে। ‘পিপলস ডেইলী’ নামের একটি রাজনৈতিক দলের মুখপত্রে প্রকাশিত নিবন্ধে স্কুলকে বলা হয়েছে ‘কাশগড়ের পল্লী শিক্ষার আকর্ষণের স্থান ।

বোর্ডিং স্কুলের পরিবার-বিচ্ছিন্ন ক্লিষ্ট শিশুদের নতুন ম্যান্ডারিন পরিবেশে বিচ্ছিন্নতার এ যন্ত্রণাকে সম্ভবত আরও বাড়িয়ে দেয়। অপরিচিত একটি ভাষার সাথে সংগ্রাম করার মাধ্যমে তারা পরিবর্তনের মাত্র একটি অংশের মোকাবেলা করছে।

জিনজিয়াংয়ের কতিপয় চীনা/হ্যান শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে স্কুলগুলোতে কিভাবে ‘আন্ত:জাতিসত্তার ঐক্য’  তরান্বিত হচ্ছে তা দেখানোর চেষ্টা চালান। দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কিভাবে উইঘুর ছাত্র-ছাত্রীরা ঐতিহ্যবাহী হ্যান/চীনা পোশাক পড়ে দেশাত্মবোধক গান হাচ্ছে। হ্যান শিক্ষকগণ তাদের জাতীয়তার বলে যথেষ্ট শক্তি প্রয়োগ করে থাকেন। এক শিক্ষকের একজন ছাত্রকে তার বিমাতা খুব মারধর করেন। তখন সেই শিক্ষক তার মুরুব্বিকে এভাবে শাসিয়ে লিখেন যে, আর যদি এভাবে মারধর করা হয়, তবে তাকে শিবিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

উইঘুরদের গৃহে গৃহে শত-সহকারী সরকারী কর্মকর্তা ও বেসামরিক লোক প্রেরণের নীতি সরকারের আরেকটি বিরক্তিকর পদক্ষেপ। এটা কিভাবে জিনজিয়াং এর হ্যান-ডমিনেটেড সরকার উইঘুর পারিবারিক জীবনকে কেটে টুকরো টুকরো করছে তার উদাহরণ (কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে এ অঞ্চলের নেতা সব সময়ই হ্যান বা চীনা বংশোদ্ভূদ হয়ে থাকে)। কর্মকর্তারা এটাকে বলছেন ‘একাত্ম হয়ে যাওয়া’ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তোলা। হ্যানরা প্রতিমাসে একাধারে দশ দিন উইঘুর পরিবারের সাথে অবস্থান করে (এটা উইঘুরদের উপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ ফেলে যদিও তাদের খাদ্য দিয়ে সহায়তা করার কথা)।

অতিথিসেবককে আগ্রহী দেখাতে হয়, নয়তো প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখী হতে হবে। মিসেস দাউতের দশ বছরের কন্যার কাছে বিশ বছরের একজনকে আত্মীয় হিসেবে ন্যস্ত করা হয়। তিনি কর্মকর্তার ছবি দেখান, যিনি তার মেয়ের পাশে বসে চা পান করছেন, হাসছেন। তিনি এ বিবরণ দিতে দিতে কেঁদে ফেলেন। একজন যুবক মানুষ আর তার কন্যার মাঝে এ অনাকাংখিত সম্পর্কের বিষয় ভেবে তিনি অত্যন্ত অস্বস্তিবোধ করছেন।

সরকার জোর দিয়ে বলছে যে, তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তারা একটি বিষয় উল্লেখ করে যে, ২০১৭ সালে যখন শিবির তৈরীর কর্মসূচি শুরু হয়, তখন থেকেই জিনজিয়াং এ কোন সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ঘটেনি। গতমাসে সরকার জিনজিয়াং এর উপর একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়েছে, অধিবাসীদের ‘প্রাপ্তি, সুখ ও নিরাপত্তাবোধ যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে’  ধন্যবাদ সরকারের গৃহীত কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগকে, যেমন- বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।


আরও বলা হচ্ছে যে, জিনজিয়াং-এ ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রায় ১.৩ মিলিয়ন মানুষকে এরূপ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু কিভাবে এটা পরিচালনা করা হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয় নি। গত বছর কর্মকর্তাগণ দাবী করেছিলেন যে, শিবিরের সবাই  স্নাতকপ্রাপ্ত হয়েছেন। কিন্তু গবেষণা সংস্থা ‘অস্ট্রেলিয়ান স্ট্রাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট’ ডজনের অধিক বন্দীশিবির চিহ্নিত করেছে। বিগত ২ বছরে এগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, কিছু বন্দীকে ভকেশনাল ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে উচ্চ নিরাপত্তা এলাকায় সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।

মিসেস দাউত বলেন, তিনি এখনো বন্দীশিবিরে থাকার ভয়ংকর অভিজ্ঞতা দ্বারা তাড়িত হন। প্রত্যেকদিন তিনি অন্যান্য সেল থেকে আগত মহিলাদের সাথে শ্রেণিকক্ষে একত্রিত হতেন। এখানে তাদেরকে ‘জি জিংপিং এর চিন্তাধারা’ অধ্যয়ন করতে হতো।

যখনই তারা এখান থেকে বের হতেন, তখন রক্ষীরা তাদেরকে জিজ্ঞাসা করতো ‘কোন আল্লাহ বা ঈশ্বর আছে কি?’ ‘হাঁ-বোধক’ জবাব দেয়ার সাথে সাথেই মারপিট শুরু হয়ে যেতো। অত:পর, তারা জিজ্ঞাসা করতো, জি জিংপিং আছে কি না, মিসেস দাউত অশ্রুসিক্ত হয়ে স্মরণ করেন। তারা বলতো,  ‘তোমার ঈশ্বর তোমাদেরকে এখান থেকে তুলে নিয়ে যেতে পারবে না, কিন্তু জি জিংপিং তোমাদের জন্য অনেক কিছুই করেছেন।

অনুবাদ : এম এন আমীন

মহাব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ ব্যাংক ।

/

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র

সম্পাদক: দিদারুল ইসলাম
প্রকাশক: আজিজুর রহমান মোল্লা
মোবাইল নাম্বার: 01711121726
Email: bartajogot24@gmail.com & info@bartajogot24.com