• বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১ , ১ বৈশাখ ১৪২৮
  • আর্কাইভ

বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১ , ১ বৈশাখ ১৪২৮

ইতিহাসের প্রাচীনতম আইন, দ্য কোড অব হাম্মুরাবি

তাসনুভা লিজা
প্রকাশিত : শনিবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২১, ০৮:৪৩

  • ইতিহাসের প্রাচীনতম আইন, দ্য কোড অব হাম্মুরাবি

    “চোখের বদলে চোখ” কথাটির সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত। কিন্তু এই নীতির প্রবর্তক কে বা কবে থেকে এমন আইনের সূচনা হয়েছে তা আমাদের অনেকের কাছেই অজানা। একটু সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থার জন্য আইন প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরী একটি কাজ। সেই লক্ষ্যে বহু আগে থেকেই পৃথিবীতে নানা ধরনের আইন প্রণীত হয়ে এসেছে। তবে সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত আইনগুলোর মধ্যে রাজা হাম্মুরাবি প্রণীত আইনগুলোকে বলা হয় প্রাচীনতম লিখিত আইন।

    হাম্মুরাবি ছিলেন ব্যবিলনের ষষ্ঠ রাজা, খ্রিস্টপূর্ব ১৭৯৫ সাল থেকে ১৭৫০ সাল পর্যন্ত ছিলো তার রাজত্বকাল। হাম্মুরাবির পিতা সিন-মুবল্লাত এর মৃত্যুর পরে হাম্মুরাবি রাজা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ব্যবিলন ছিলো মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) একটি শহর, এই শহর রাজা হাম্মুরাবির সময়কালে আধুনিক মহানগরীতে পরিণত হয়েছিলো। রাজা হাম্মুরাবির সময়কালেই ব্যবিলনের সবচেয়ে বেশি উন্নতি সাধিত হয়েছিলো এবং হাম্মুরাবির একের পর এক রাজ্য জয় তার সাম্রাজ্যকে আরো বিস্তৃত করে তুলেছিলো।


    আইন প্রণয়নের শুরুতে হাম্মুরাবি নিজেকে দেবতা কর্তৃক নিয়োজিত ন্যায়বিচারের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন এবং প্রস্তাব করেন, যে আইন গুলো তিনি প্রণয়ন করছেন সেগুলো ন্যায়বিচারকের দেবতা “শামাস” তার মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন। তার প্রণীত ২৮২ টি আইনকে একসাথে বলা হয় ‘দ্য কোড অব হাম্মুরাবি’। এইসব আইন স্লেটে খোদাই করে লেখা হতো আক্কাদীয় ভাষায় এবং কিউনিফর্ম লিপিতে। প্রায় ৭ফুট দীর্ঘ ফলকে আইনগুলো সারি সারি করে বিভিন্ন কলামে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিলো। তাই এসব আইনের বেশ কিছু অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে বা ফলক থেকে মুছে গিয়েছে, যেগুলো পরবর্তিতে উদ্ধার করা সম্ভর হয়নি। বেশিরভাগ আইন অবশ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ১৯০১ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ জ্যক দ্য মর্গানের তত্ত্বাবধানে এই আইনগুলো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ১৯০১ সালেই উদ্ধার করার পর আইনগুলো ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন জিয়ান-ভিনসেট সেইল। এর পর বিভিন্ন ভাষায় আইনগুলো অনুবাদ করা হয়।

    এমনকি বাংলা ভাষায় “হাম্মুরাবির আইন” নামের বইয়ে আইনগুলোর বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে।

    হাম্মুরাবির আইনগুলো একদিকে যেমন ন্যায়বিচারকে কেন্দ্রে করে গড়ে উঠেছিলো, আবার অনেক সময় বৈষম্যও ছিলো। তৎকালীন সময়ে নাগরিকের শ্রেণি ছিলো তিনটি। সম্ভ্রান্ত পরিবার, রাজা, শিল্পী, অভিজাত ব্যক্তিরা ছিলো প্রথম শ্রেণির নাগরিক। তাদেরকে বলা হতো “আমেলু”, এরপর সাধারণ ব্যক্তি, স্বাধীন ব্যক্তিদের বলা হতো “মুসকিনু” এবং দাস শ্রেণির নগরিকদের বলা হতো “আর্দু”। প্রথম শ্রেণির নাগরিকরা অন্যায়ের শাস্তি হিসেবে জরিমানা দিয়ে মাফ পেয়ে গেলেও দাস শ্রেণিকে দেয়া হতো মৃত্যুদণ্ড। দাসদের কেনাবেচা করার প্রচলন ছিলো। প্রত্যেক দাসের শরীরে দাস-চিহ্ন দেয়া থাকতো এবং এই চিহ্ন যদি কোনো নাপিত কেটে ফেলতো বা মুছে ফেলতো তাহলে তার হাত কেটে দেয়া হতো। তবে নাগরিকের শ্রেণিবিভাগ করা হলেও প্রত্যেক শ্রেণির নাগরিকদের জন্য ছিলো নির্ধারিত নীতিমালা।


    আইনগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ছিলো ঈশ্বরের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। এমনও আইন ছিলো যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নদীতে ঝাঁপ দিতে হতো, যদি সে নদীতে ডুবে যেতো তাহলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হতো এবং এভাবেই তার মৃত্যু হতো। আর যদি সে পানিতে ভেসে থাকতো বা বেঁচে থাকতো, তাহলে তাকে নির্দোষ সাব্যস্ত করা হতো। অসচেতনা বা অবহেলার জন্যও শাস্তি পেতে হতো হাম্মুরাবির আইন অনুযায়ী। যেমন, কেউ যদি তার বাড়ি বা জমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতো এবং কয়েক বছর পর্যন্ত ফিরে না আসতো এবং অন্য কেউ এই বাড়ি বা জমির দখল নিতো, তাহলে আসল মালিক আর তা ফেরত পেতো না। নিজের সম্পদের প্রতি অবহেলার শাস্তির বিধান অনেকটা এমনই ছিলো।

    হাম্মুরাবির আইনগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিলো ন্যায্যা বিচার এবং কঠোরতা। যদি কোনো ব্যক্তি কারো বাড়ি নির্মাণ করে দিতো এবং সেই বাড়ি ধ্বসে গিয়ে বাড়ির মালিক মারা যেতো, তাহলে যে ব্যক্তি বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছে, তাকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো। যদি কোনো চিকিৎসক অসাবধনতায় কারো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে ফেলতো, তাহলে চিকিৎসককে জরিমানা দিতে হতো এবং শাস্তি ভোগ করতে হতো।

    হাম্মুরাবির আইনের ২৮২ টি আইন দ্বারা বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে যেখানে কৃষি, বাণিজ্য, অর্থনীতি, শিক্ষা, অভিভাবক, বিয়ে, ব্যভিচার, মহিলাদের অধিকার ইত্যাদি নিয়ে শাস্তি ও ন্যায়প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। বিয়ের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন যৌতুকের ব্যবস্থা ছিলো, আবার বিয়ের জন্য স্ত্রীকে ও তার পরিবারকে টাকা দেয়ার রীতি ছিলো। তালাকের পর যৌতুকের টাকা ফেরত দেয়ারও নিয়ম ছিলো। ব্যভিচারের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা ছিলো ভয়াবহ। যদি কেউ ব্যভিচারের জন্য ধরা পড়তো, তাহলে তাকে জীবিত মেরে ফেলা হতো।

    নারীদের জন্যও যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেছে এই আইন। পিতার সম্পত্তি, স্বামীর সম্পত্তিতে তাদের অধিকার ছিলো, স্বামী মারা যাওয়ার পর সম্পদ এবং সন্তানদের দায়িত্ব দেয়া হতো স্ত্রীর উপর। এমনকি স্বামীর পরবর্তিতে বিয়ের ক্ষেত্রেও স্ত্রীর অনুমতি নেয়ার বিধান ছিলো, যদিও পুরুষদের বহুবিবাহের প্রচলন ছিলো। কারো স্বামী যুদ্ধে মারা গেলে সেই মহিলা দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে পারতো।


    ব্যবিলনে সেই সময়ে ধর্ম ছিলো মূলত মিথোলজি নির্ভর। রাজা হাম্মুরাবি এবং তার রাজ্যের জনগণ সেই সময়ে বহুঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন। ধর্মের বেশিরভাগ বিশ্বাসই এসেছিলো সুমেরীয় ধর্ম থেকে। হাম্মুরাবির আইনের প্রস্তাবনা অংশে অনেক দেব-দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন আনু, বা’ল, মার্দুক, ইয়া, শামাস, সিন, নারগাল, তিয়ামাত, দুমাস, নিনাজু, জামামা, নিন-তু, নেবু, আপ্সু এবং আরো অনেকে। সুমেরীয়দের এবং ব্যবিলনের অধিবাসীদের বিশ্বাস অনুযায়ী একেকজন দেব দেবী পৃথিবীর এক এক অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাই তাদের অনেক আইনই ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত।

    ব্যবসায়িক সকল লেনদেন হতো চুক্তিভিত্তিক। চুক্তিফলকের উপর খোদাই করে চুক্তি লেখা হতো, লেনদেনের কাজ শেষ হলে ফলক ভেঙ্গে ফেলা হতো। ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রেও এমন ঋণ-ফলক ব্যবহার করা হতো।


    আবার চাষাবাদের জন্য ছিলো নানা আইনব্যবস্থা। কৃষকদের যথেষ্ট পরিশ্রম করে ফলন করতে হতো এবং ভালো ফলন না হলে জরিমানা দিতে হতো। অন্যের জমি নষ্ট করা, সেঁচের কারণে অন্যের জমিকে প্লাবিত করা, এসব অন্যায়ের জন্যও জরিমানা দিতে হতো।

    হাম্মুরাবির আইনগুলো থেকে তৎকালীন সময়ের কঠোর শাস্তিব্যবস্থা, ধর্মের প্রতি বিশ্বাস, সমাজব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান লাভ করা যায়। যদিও অনেক উদ্ভট ও অগ্রহণযোগ্য আইনের উল্লেখ পাওয়া যায়, তবুও সেই সময়ে ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে হাম্মুরাবির আইনগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ফ্রান্সের ল্যুভর জাদুঘরে হাম্মুরাবির আইনের ফলক সংরক্ষিত আছে। হাম্মুরাবির আইনগুলোই প্রাচীনতম আইন কিনা তা নিয়ে সম্প্রতি ইতিহাসবিদগণ সন্দেহ প্রকাশ করেছে। অনেকের মতে হাম্মুরাবির আইনের পূর্বেও ইবলা কোড নামের আইন ছিলো। তবে প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসবিদগণের কাছে হাম্মুরাবির আইন বা দ্য কোড অব হাম্মুরাবি আজীবন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে পরিচত থাকবে।


    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    শনি
    রোব
    সোম
    মঙ্গল
    বুধ
    বৃহ
    শুক্র

    সম্পাদক: দিদারুল ইসলাম
    প্রকাশক: আজিজুর রহমান মোল্লা
    মোবাইল নাম্বার: 01711121726
    Email: bartajogot24@gmail.com & info@bartajogot24.com