• বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১ , ১ বৈশাখ ১৪২৮
  • আর্কাইভ

বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১ , ১ বৈশাখ ১৪২৮

আদিবাসী হতে পরাশক্তি হওয়া আমেরিকার ইতিহাস

বার্তাজগত২৪ডেস্ক
প্রকাশিত :শুক্রবার, মার্চ ৫, ২০২১, ১১:৩৪

  • আমেরিকার ইতিহাস

    আমেরিকা! বর্তমান পৃথিবীর উপর ছড়ি ঘুরানো বিশ্বমোড়ল হিসেবে পরিচিত এ দেশটির ইতিহাস কি? শুরু থেকেই কি মোড়ল ভূমিকায় ছিল তারা? কিভাবে পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হলো এই দেশ? এ সকল প্রশ্নেরই সীমিতাকারে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব আজ আমরা। 


    আমেরিকার ইতিহাস শুরু হয় সেই চল্লিশ হাজার বছর আগের এক ঘটনা দ্বারা। বর্তমান পৃথিবীর সাইবেরিয়া অঞ্চল বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে শীতলতম স্থান হিসেবে পরিচিত হলেও সে সময়কালে স্থানটি সুজলা সুফলা হিসেবেই পরিচিত ছিল, সেখানটায় মোঙ্গলয়েড নামের আদিবাসীরা বসবাস করত।

    চলিশ হাজার বছর আগের সে সময়টায় জলবায়ু পরিবর্তনের দরুন শুরু হয় মোঙ্গলয়েড নামের আদিবাসীরা। যাতে ধীরে ধীরে সে অঞ্চল আচ্ছাদিত হতে থাকে বরফে। মারা যাতে থাকে মানুষ, বিলুপ্ত হতে থাকে নানা প্রজাতির প্রাণি। বাঁচার তাগিদে মানুষ বর্তমান রাশিয়ার পূর্বভাগ থেকে আমেরিকার পশ্চিম ভাগের দিকে স্থানান্তরিত হতে থাকে। বর্তমানে ম্যাপে আমেরিকা ও রাশিয়া মাঝে কোন ভৌগোলিক যোগাযোগ না থাকলেও তৎকালে আইস এইজের কারণে বেরিং প্রণালির উপর বরফের এক ধরণের প্রাকৃতিক ব্রিজ তৈরি হয় যার মাধ্যমেই ধীরে ধীরে সে মঙ্গলয়েড জাতি স্থানান্তরিত হতে থাকে আমেরিকার পশ্চিমভাগ বা বর্তমান আলাস্কার দিকে। 

    সেদিকটাতে স্থানান্তরিত হতে থাকলেও সেখানকার অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিলো না। বরফে মোড়াই ছিল সে অঞ্চল, যার কারণে তারা আমেরিকার পশ্চিমভাগ হতে দিন দিন আরো দক্ষিণ বা বর্তমান আমেরিকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে এ মঙ্গলয়েড আদিবাসী। হাটতে হাটতে একসময় তারা সেখানে ছবির মত সুজলা সুফলা এক জায়গার খোঁজ পায়।

    ইতিহাসবিদদের মতে সাইবেরিয়া থেকে স্থানান্তর হয়ে আমেরিকায় আসার এই প্রক্রিয়াটি চলমান থাকে চল্লিশ হাজার বছর পূর্ব থেকে দশ হাজার বছর পূর্ব পর্যন্ত। এরপর পুনরায় সে বেরিং প্রণালির উপর দৃশ্যমান হওয়া বরফের ব্রিজটি অদৃশ্য হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে মঙ্গলয়েড জাতি সেখানে গড়ে তুলতে শুরু করে নানা সভ্যতা এবং তা সময়ের আবর্তনে বিলিনও হতে শুরু করে এদের মধ্যে অন্যতম আদেনা সভ্যতা, ইরোকিয়োস সভ্যতা, মিসিসিপায়ান সভ্যতা, কোলস ক্রিক সভ্যতা ইত্যাদি। সকল কিছু ঠিকই যাচ্ছিল এমন সময়ই চিত্রনাট্যে প্রবেশ করেন পর্তুগিজ নাবিক কলোম্বাস ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিস্কার করার মাধ্যমে।  

    তৎকালে ইন্ডিয়া নামে এক মহাদেশের মিথ বেশ প্রচলিত ছিল যা সম্পর্কে তারা ভাবত সেখানে মাটিতে কুড়িয়ে কুড়িয়েই সোনা পাওয়া যায়। সুতরাং, সে কুড়িয়ে পাওয়া সোনার মহাদেশ খুজতে বেড়িয়ে পড়েন আমাদের ক্রিস্টোফার কলোম্বাস। এ ব্যাক্তি ভুলবশত ইন্ডিয়া আবিস্কার করতে যেয়ে আবিস্কার করে ফেলেন বর্তমান আমেরিকা মহাদেশ। তিনি জাহাজ থেকে নেমে দেখেন কিছু লাল লাল মানুষ সে অঞ্চলে বিচরণ করছে। এ দেখে তিনি তাদের নাম দিলেন "রেড ইন্ডিয়ান "। অনেকেই রেড ইন্ডিয়ানদের ভারতের বংশদ্ভূত জাতি ভেবে থাকলেও এটি সম্পূর্ণ ভূল ধারণা এরা ভারতীয় বংশদ্ভূত কোন জাতি নয়, আমেরিকান দের সর্বোপ্রাচীন অধীবাসী হিসেবে স্বীকৃত এক জাতি। 

    ক্রিস্টোফার কলোম্বাসের আমেরিকা আবিস্কারের পরই সে অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদের বিষাক্ত নিশ্বাস আশ্রয় নেয়া শুরু করে। বেশি বেশি বাণিজ্যিক বোট, জাহাজ আসা শুরু করে ব্রিটিশরা বিভিন্ন আইল্যান্ড যেমন পুয়ের্তো রিকো, কিউবা নিজেদের করে নিতে থাকে। ফ্রান্স পূর্ব উত্তর আমেরিকায় সাম্রাজ্য স্থাপন করে, পর্তুগাল ব্রাজিলকে নিজেদের সাম্রাজ্যের অধীন করে নেয়। সেখানে ক্ষণে ক্ষণে এসকল সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ব্রিটিশ ফরাসী এবং রেড ইন্ডিয়ান দের মাঝে লড়াই চলতে থাকে। যেখানে রেড ইন্ডিয়ানরা তাদের অস্তিত্বের জন্য এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরা তাদের সাম্রাজ্য বৃদ্ধির জন্য লড়তে থাকে।   

    বহু কাঠখড় পোড়ানোর পর ইংরেজরা ১৬০৭ সালে জেমসটাউনে তাদের প্রথম শহর নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। এরপর জেমসটাউন কে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে তারা আরো শহরকে সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে থাকে।  ১৬১০ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তাদের ৫০ হাজারেরও বেশি বিপ্লবীকে আমেরিকায় পাঠায়। আধুনিক আমেরিকার সিংহভাগ মানুষই তাই মূলে ব্রিটিশ বংশদ্ভূত বলা চলে। 

    ১৭৬০ সাল পর্যন্ত তেরোটি ব্রিটিশ কলোনি দেখা যায় যা প্রায় ২৫ লাখ মানুষ ধারণ করত।  ১৭৫৬-৬৩ সালে ব্রিটিশ-ফ্রান্স যুদ্ধ শুরু হয়। যাতে পরাজিত হয় ফ্রান্স। প্যারিসের সন্ধি চুক্তি দ্বারা এ যুদ্ধের অবসান ঘটলেও পুরো উত্তর আমেরিকার ক্ষমতা চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে। এ যুদ্ধে জয় লাভের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ট্যাক্সের মাত্রা বাড়িয়ে, সাধারণ মানুষের উপর শোষণ বাড়িয়ে একের পর এক আইন পাশ করতে থাকে যার মধ্যে অন্যতম স্ট্যাম্প এক্ট-১৭৬৫, নেভিগেশন এক্ট, সুগার এক্ট,কারেন্সি এক্ট ইত্যাদি যা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করে। 

    ১৭৭৪ সালে ফিলাডেলফিয়ার এক সম্মেলনে তেরটি উপনিবেশের মাঝে বারোটি উপনিবেশ উপস্থিত হয়ে নিজেদের প্রতি হওয়া অত্যাচারের প্রতিকার চায় এবং জনকল্যাণকর আইন প্রত্যাশা করে৷ কিন্তু আবেদনে কোন ফল না মেলায় গ্রেট লিডার "জর্জ ওয়াশিংটন" কে সেনাপতি করে ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে একটি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে দেয় এ তেরোটি উপনিবেশ ৷ এ যুদ্ধটিই ছিলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রথম সফল স্বাধীনতা যুদ্ধ। আমেরিকা এ যুদ্ধে জয় লাভ করে। ১৭৮৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ক্যালিফোর্নিয়া কনভেনশন বর্তমান মার্কিন সংবিধানটি গ্রহণ করে। পরবর্তী বছর এ সংবিধান স্বাক্ষরিত হলে যুক্তরাষ্ট্র একটি কেন্দ্রীয় সরকার সহ একক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। 

    উনিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাজ্য, মেক্সিকো ও রাশিয়া থেকে জমি অধিগ্রহণ করে এবং টেক্সাস প্রজাতন্ত্র ও হাওয়াই প্রজাতন্ত্রকে অধিকার করে নেয়। ১৮৬০ এর দশকে দাসত্ব প্রথাকে কেন্দ্র করে শিল্পোন্নত অঞ্চল ও গ্রামীন অঞ্চলের মাঝে রক্তক্ষয়ী সিভিল ওয়ার শুরু হয়। আব্রাহাম লিংকনের আবির্ভাব ও গ্রামীন অঞ্চল বা দাস প্রথার বিরুদ্ধের শক্তি জয়লাভের মাধ্যমে এ যুদ্ধ শেষ হয় এবং আমেরিকার সংবিধানে মানবাধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে ভিরাট সংশোধন নিয়ে এক নতুন আমেরিকা হিসেবেই বলা যায় আবির্ভূত হয়। ১৮৭০ এর দশকেই যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। 

    স্পেন-মার্কিন যুদ্ধ ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে আমেরিকা নিজেকে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে পরিচিতি পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পৃথিবীর প্রথম পরমাণু ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হিসেবে আত্বপ্রকাশ এবং এর ভয়ানক প্রয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে এক ভয়ানক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়। জাতিসংঘে স্থায়ী সদস্যপদ প্রাপ্তি ও পরে কোল্ড ওয়ারের কারণে দ্য গ্রেট সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর একমাত্র মহাশক্তিধর পরাশক্তিতে পরিণত হয়। 


    ১৯৩০ এর দশকে এবং একবিংশ শতকের প্রথম দশকের শেষে আমেরিকা মহাদেশ অর্থনৈতিক মহামন্দা বা "দ্য গ্রেট ডিপ্রেশনের" শিকার হয়। 

    দেশটি বর্তমানে বিশ্বের মোট সামরিক ব্যায়ের দুই-পঞ্চমাংশ একাই ব্যায় করে থাকে। সাধারণ এক মঙ্গলয়েড জাতি দ্বারা শুরু হওয়া এ জাতির উপাখ্যান বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। 

    মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    শনি
    রোব
    সোম
    মঙ্গল
    বুধ
    বৃহ
    শুক্র

    সম্পাদক: দিদারুল ইসলাম
    প্রকাশক: আজিজুর রহমান মোল্লা
    মোবাইল নাম্বার: 01711121726
    Email: bartajogot24@gmail.com & info@bartajogot24.com