জীবনানন্দ দাশ: কলম হাতে যিনি হৃদয় হনন করেছিলেন

বার্তাজগৎ২৪/ এমএ
বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক : বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক :
প্রকাশিত: ৭:৩৪ অপরাহ্ন, ১৯ অগাস্ট ২০২২ | আপডেট: ৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২
জীবনানন্দ দাশ

"কবি,
আমি কখনো গদ্যাকার হতে চাইনি; আমি আপনার মত একজন হতে চেয়েছি। হায় এত প্রতিভা আমাকে দেয়া হয়নি”-

লীলাবতী(হুমায়ুন  আহমেদ)

সহজ সরল স্বীকারোক্তি একজন কিংবদন্তি  হতে আরেকজন কিংবদন্তির প্রতি। উক্তিটি হুমায়ূন আহমেদ জীবনানন্দ দাশকে উদ্দেশ্য করে তার (লীলাবতী) উপন্যাসের প্রারাম্ভে বলেছিলেন।

সে কবি বাংলা ভাষার শুদ্ধতম কবি, তিমির হননের কবি, তিনি কবি জীবনানন্দ দাশ। যে ছেলেটির মা ছিলেন গৃহস্থ পরিবারের আদর্শ একজন নারী, সেই কুসুমকুমারী দাশের কবিতা-আদর্শ ছেলে,

"আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো হবে’'

কবি হিশেবে জীবনানন্দ দাশ একজন চেনা পরিচিত কবি, কিন্ত যখন তার কবিতা পড়ি, মনে হয় কি যেন নেই হায়, কি যেন নাই। একজন মানুষ কি পরিমাণ প্রতিভা থাকলে কবি জীবনানন্দ দাশ হয়ে ওঠেন তা বিচার করার মানদণ্ড আমার নেই।শুধু জানি জীবনানন্দ দাশ একজন গল্পাকার, যিনি বিশুদ্ধ প্রকৃতি কে জীবনের স্বরূপ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, সন্ধ্যায় শংখচিলের ঘরে ফেরা কিংবা সকালে ভোরের নাটার রং সবকিছু ছাপিয়ে তিনি আজন্ম একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ কবি জাদুকর জীবনানন্দ দাশ।

দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে শিক্ষক ও সাহিত্যপিপাসু মা–বাবার জৈষ্ঠ্য সন্তান তিনি। তাঁর ডাকনাম ছিল মিলু। বাবা কমবয়সে স্কুলে ভর্তি হওয়ার বিরোধী ছিলেন বলেই ভোরে ঘুম থেকে উঠেই পিতার কণ্ঠে উপনিষদ আবৃত্তি ও মায়ের গান শুনে তাঁর বেড়ে ওঠা।

১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে আট বছরের মিলুকে ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। সেখান থেকে ১৯১৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯১৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম বিভাগে পাস করেন। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ ডিগ্রি, ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ করেননি।

কবির ৫৬ বসন্তের ছোট্ট এক টুকরো জীবনটি কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। পেশা মূলত শিক্ষকতা হলেও কর্মজীবনে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কোথাও থিতু হতে পারেননি। তিনি অধ্যাপনা করেছেন বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের অনেকগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। যার মধ্যে আছে সিটি কলেজ, কলকাতা (১৯২২-১৯২৮), বাগেরহাট কলেজ, খুলনা (১৯২৯) ; রামযশ কলেজ, দিল্লি (১৯৩০-১৯৩১), ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল (১৯৩৫-১৯৪৮), খড়গপুর কলেজ (১৯৫১-১৯৫২), বড়িশা কলেজ (অধুনা ‘বিবেকানন্দ কলেজ’, কলকাতা) (১৯৫৩) এবং হাওড়া গার্লস কলেজ, কলকাতা (১৯৫৩-১৯৫৪)।

ধূসর পান্ডুলিপি, ঝরা পালক, রূপসী বাংলা, তিমির হনন, পৃথিবীর পথে ইত্যাদি তার অনবদ্য সৃষ্টি।

১৮ লাইনের এই অনিন্দ্যসুন্দর সৃষ্টি বর্তমানে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতার একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ‘বনলতা সেন’ কবিতার কয়েক লাইন-

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
“মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।”

প্রেয়সীকে হয়ত খুব আটকে রাখতে যেয়েও পারেননি। আকাশলীনা কবিতায় বলেছিলেন,


"সুরঞ্জনা, ঐখানে যেয়োনাকো তুমি,
বোলোনাকো কথা অই যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা:
নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে"


আবার চলে যাওয়া প্রেয়সীকে নিমন্ত্রণ জানিয়ে (ফিরে এসো) কবিতায় বলেছিলেন,

"ফিরে এসো সমুদ্রের ধারে,
ফিরে এসো প্রান্তরের পথে;
যেইখানে ট্রেন এসে থামে"

প্রেম, বিরহ, দেশত্ববোধ, প্রকৃতি প্রেম, রোমান্টিকতা সবকিছু ছাপিয়ে রূপসী বাংলার কবি একজন কালজয়ী স্বত্তা। প্রকৃতি পৃথিবী ধ্বংস পর্যন্ত থাকবে, এজন্য হয়ত প্রকৃতির ছোট ছোট অস্তিত্ব পাতার ফাঁকের আলো, জলের উপর ছায়া, অন্ধকার, জোনাকি, জোস্না কবিকে মনে রাখবে। প্রকৃতি তো আর মানুষের মত কৃতঘ্ন নয়।

আধুনিক বাংলা কবিতার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশ। তিনি বলেছিলেন:

"প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন ক্ষয়ে যেতে হয়"

জীবনানন্দ দাশও ক্ষয়ে গেছে মহাকালের ভীরে, রয়ে গেছে কর্ম, কবিতা ও প্রেম।

১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় এক ট্রাম দূর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে জীবনানন্দ দাশ অকালে মৃত্যুবরণ করেন।

মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ উক্তি ছিল, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপির রং সারাটা আকাশ জুড়ে’।

আরব্য রজনীর গল্পাকারকে জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে এ লেখা শেষ করার আহ্বান জানাচ্ছি, যদিও তা অসম্ভব। আমি বরং এখানেই থেমে যাই, চলতে থাকুক জীবনানন্দ দাশ হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে, কিশোরীর প্রথম প্রেমে।

ফাইজুল ইসলাম ফাহিম
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বার্তাজগৎ২৪/ এমএ