ইতিহাসের পাতায় অজেয় বঙ্গবন্ধু এবং আজকের তারুণ্য

বার্তাজগৎ২৪/ এমএ
অপু ভট্টাচার্য্য : অপু ভট্টাচার্য্য :
প্রকাশিত: ৯:০৮ অপরাহ্ন, ১৮ অগাস্ট ২০২২ | আপডেট: ৫:৫২ পূর্বাহ্ন, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বর্তমানে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই তরুণ জনগোষ্ঠী। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি ৭৬ লাখ তরুণ রয়েছে। কিন্তু এই তরুণ সমাজের কতজন বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস তথা ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধীনায়ক বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানেন? ‘পূর্ব বাংলা’ থেকে ‘বাংলাদেশ’ হওয়ার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে সর্বাগ্রে ছিল বাঙালি তরুণ সমাজ। শোষকশ্রেণির প্রতি তরুণদের আপোষহীন মনোভাবের কারণেই আমরা পেয়েছি আমাদের প্রাণের ভাষা, প্রিয় পতাকা এবং এই সোনার মাতৃভূমি। তবে এসব কিছু কিন্তু এত সহজে বাঙালিদের হস্তগত হয়নি। এজন্য বিসর্জন দিতে হয়েছিল বহু তাজা প্রাণ।

মূলত বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের বীজ রোপিত হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত প্রথম শহীদ ছিলেন রফিকউদ্দিন আহমদ (রফিক)। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ২৬ বছর। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মাথার খুলি উড়ে যাওয়া লাশ দেখতে পেয়ে আব্দুল গাফফার চৌধুরী সেখানেই ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি’- এই দুটি লাইন রচনা করেছিলেন। অপরদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অসুস্থ শাশুড়ির জন্য কিছু ফলমূল কিনতে বেড়িয়েছিলেন ৩৩ বছর বয়সী আব্দুল জব্বার। পথে রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে স্লোগানরত একটি মিছিল দেখে তিনি ফল কেনার কথা ভুলে মিছিলের সামনের দিকে চলে আসেন। কিছুক্ষণ পরেই পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে তিনি নিহত হন। পুলিশের অতর্কিত গোলাগুলি শুধু যে মিছিলে থাকা মানুষগুলোকে লক্ষ্য করেই করা হয়েছিল তা নয়, মিছিলে না থেকেও হোস্টেলের শেডের বারান্দায় থাকা সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করা ২৫ বছর বয়সী আবুল বরকত গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলে অংশ নেওয়া আরও একজন ভাষা শহীদ ছিলেন আব্দুস সালাম। গুলিবিদ্ধ হওয়ার দেড় মাস পর ২৭ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর নানাভাবে শোষণ-অত্যাচার করতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানের এই বৈষম্যমূলক আচরণের প্রেক্ষিতে ১৯৬৬ সালে তৎকালীন আওয়ামীলীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল- (১)শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় প্রকৃতি, (২) কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা, (৩) মুদ্রা বা অর্থ-সম্বন্ধীয় ক্ষমতা, (৪)রাজস্ব, কর, বা শুল্ক সম্বন্ধীয় ক্ষমতা, (৫) বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা, এবং (৬) আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার ৬ দফা দাবি মেনে না নিয়ে বাঙালি জাতির কণ্ঠ রোধ করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ নামে মামলা করে, যার প্রকৃত নাম ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান’। ১৯৬৯ সালের ২০শে জানুয়ারি এক প্রতিবাদী মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহন হন ছাত্রনেতা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (আসাদ)। ২৪শে জানুয়ারি সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে গ্রেফতারকৃত সকল বন্দিদের মুক্তি এবং পাকিস্তানি সামরিক শাসন উৎখাতের দাবিতে সাধারণ মানুষ মিছিল বের করে। সেই মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সেদিন কিশোর মতিউর রহমান মল্লিকসহ চারজন নিহত হন। দুর্বার গণ আন্দোলনের কারণেই পাকিস্তানের লৌহ মানব খ্যাত সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং পশ্চিম পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত দাবি-দাওয়া মানতে বাধ্য হন। ৬৯-এর গণ আন্দোলনের ফলেই শেখ মুজিবুর রহমান আপামর বাঙালি জনগণের কাছে প্রিয় নেতা হয়ে উঠেন এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি লাভ করেন। মূলত এই আন্দোলন সর্বস্তরের বাঙালি জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল, তাই একে গণঅভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
“আমি কি কেবল নিজের জন্য তোকে মানুষ করেছি? এ দেশটাও তোর মা। যা দেশটাকে স্বাধীন করে আয়।” শহীদ আজাদের মহিয়সী মা সাফিয়া বেগম ছেলেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিতে গিয়ে একথাই বলেছিলেন। আজাদ ছিলেন শিক্ষিত, সুদর্শন এবং মেধাবী এক তরুণ। বন্ধুমহলে যিনি ‘এলভিস প্রিসলি’ নামে পরিচিত ছিল। যুদ্ধ শুরু হলে মায়ের কাছ থেকে অনুমতি আর আশির্বাদ নিয়ে আজাদ যুদ্ধ করতে গেল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনি রাজাকারদের হাতে ধরা পড়লেন। হানাদাররা তাঁর কাছ থেকে তথ্য জানার জন্য অকথ্য অত্যাচার করত। ছেলের এত অত্যাচারের কথা জানার পরেও সাফিয়া বেগম ছেলেকে নিষেধ করেছিলেন কারো নাম প্রকাশ করতে। আজাদ সেকথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল। আজাদ তাঁর মায়ের কাছে ভাত খাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। পরের দিন আজাদের জন্য ভাত নিয়ে থানায় এসে দেখে আজাদ আর সেখানে নেই। ততক্ষণে হয়তো আজাদের নিথর দেহ পড়েছিল কোন বদ্ধভূমিতে। সেদিনের পর থেকে মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত সাফিয়া বেগম ভাত খাননি। আরেক শহীদ জননী জাহানারা ইমামও তাঁর ছেলে শফী ইমাম রুমীকে দেশের জন্য কোরবানি করে দিয়েছিলেন। এরকম আরও বহু তরুণ নিজের পরিবারকে ছেড়ে পাক হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে মাতৃভূমিকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করে গেছেন।

বাঙালি তরুণ সমাজ যার কথায় যুদ্ধে যাবার জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিল, তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধীনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” – পাকিস্তানের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মত এই ডাক তরুণদের ঘরে রাখতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের আহ্বানে সারা দিয়েছিল এ দেশের জাতি-ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আপামর জনসাধারণ। তরুণ বয়স থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান দয়ালু হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। একবার প্রচণ্ড শীতে এক বৃদ্ধকে কষ্ট পেতে দেখে তিনি তাঁর নিজের চাদরটা সেই বৃদ্ধকে দিয়ে দেন। তরুণ বয়সেই শেখ মুজিব গণ মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীনতার জন্য কারাবরণ করেছেন বহুবার। এতে কখনো তিনি বিচলিত হননি। বরং এতে তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্কতা বেড়েছে বহুগুণ। একজন সাধারণ মানুষ থেকে বঙ্গবন্ধু যে হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক, সেই পথ পরিক্রমা সম্ভব হয়েছে তাঁর জীবনে কিছু মানুষের সোনালি স্পর্শ ও অবদানের কারণে। আর এক্ষেত্রে যেসব মানুষের নাম করতে হবে, তাঁদের মধ্যে সবার আগে আসবে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নাম। বঙ্গবন্ধুর এই সহধর্মিনী বিয়ের পর বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিটি সংগ্রামে তাঁর পাশে থেকে জুগিয়ে গিয়েছেন নিরন্তর সাহস ও অনুপ্রেরণা এবং করে গেছেন সহযোগিতা।

শেখ মুজিবুর রহমান যখন জেলে থাকতেন তখন তাঁর ছায়া হয়ে কাজ করতেন তাঁরই আস্থাভাজন জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ যেন একই বৃন্তে দুটি কুসুম।
যাত্রীদের মন শঙ্কায় অভিভূত।
মেয়েরা কাঁদছে; পুরুষেরা উত্ত্যক্ত হয়ে ভর্ৎসনা করছে, চুপ করো।
কুকুর ডেকে ওঠে, চাবুক খেয়ে আর্ত কাকুতিতে তার ডাক থেমে যায়।
রাত্রি পোহাতে চায় না।
অপরাধের অভিযোগ নিয়ে মেয়ে পুরুষে তর্ক তীব্র হতে থাকে।
সবাই চীৎকার করে, গর্জন করে,
শেষে যখন খাপ থেকে ছুরি বেরোতে চায়
এমন সময় অন্ধকার ক্ষীণ হল--
প্রভাতের আলো গিরিশৃঙ্গ ছাপিয়ে আকাশ ভরে দিলে।
হঠাৎ সকলে স্তব্ধ;
সূর্যরশ্মির তর্জনী এসে স্পর্শ করল
রক্তাক্ত মৃত মানুষের শান্ত ললাট।
মেয়েরা ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠল, পুরুষেরা মুখ ঢাকল দুই হাতে।
কেউ বা অলক্ষিতে পালিয়ে যেতে চায়, পারে না;
অপরাধের শৃঙ্খলে আপন বলির কাছে তারা বাঁধা।
পরস্পরকে তারা শুধায়, কে আমাদের পথ দেখাবে।
পূর্বদেশের বৃদ্ধ বললে,
আমরা যাকে মেরেছি সেই দেখাবে।
সবাই নিরুত্তর ও নতশির।
বৃদ্ধ আবার বললে, সংশয়ে তাকে আমরা অস্বীকার করেছি,
ক্রোধে তাকে আমরা হনন করেছি,
প্রেমে এখন আমরা তাকে গ্রহণ করব,
কেননা, মৃত্যুর দ্বারা সে আমাদের সকলের জীবনের মধ্যে সঞ্জীবিত
সেই মহামৃত্যুঞ্জয়।
সকলে দাঁড়িয়ে উঠল, কণ্ঠ মিলিয়ে গান করলে
"জয় মৃত্যুঞ্জয়ের জয়'। (শিশুতীর্থ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় ও রক্তাক্ত অধ্যায় হচ্ছে ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট। এই দিনেই বাঙালি তাঁর মহান নেতা মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হারিয়েছে। ১৫ আগস্ট শোক ও বেদনার মধ্যেও সমগ্র জাতিকে ঐক্য, উন্নয়ন ও প্রগতির পথে চলার শপথে উদ্ভাসিত করে। স্বাধীনতার শত্রু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধবাদী অপশক্তিকে সম্মিলিতভাবে রুখে দেওয়ার প্রত্যয়ে বলীয়ান করে বাঙালি ও বাংলাদেশকে। বীরত্ব, ত্যাগ, দৃঢ়প্রত্যয়, নেতৃত্বগুণ—একজন রাজনীতিক হিসেবে এর সব কটির সম্মিলন জাতি দেখেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে, যা সহজেই তাঁকে স্বাধীনতার স্থপতি ও জাতির পিতার মর্যাদায় আসীন করেছে। ঘাতকেরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও তিনি স্থান নিয়েছেন বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে।

 

আজকের তরুণ সমাজকে জানতে হবে বঙ্গবন্ধু একাধারে জীবন সংগ্রামের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ও আদর্শের প্রতীক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কারিগর, উদার ব্যক্তিত্ব এবং শোষিতের পক্ষের একজন রাজনীতিবিদ। বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে দিয়েছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক রাজনীতি, অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষতা। বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করতে হলে রাষ্ট্রের প্রতিটি কাঠামোতে এ চারটি বীজ পরিচর্যা এবং লালন-পালন করতে হবে। মনস্তাত্বিকভাবে তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। একটি দেশের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে যখন তরুণ প্রজন্ম অজ্ঞ থাকবে, সে তরুণ প্রজন্ম বারবার বিভ্রান্তের দিকে পা বাড়াবে। ক্ষমতাসীন দলে বড় মিছিল দৃষ্টিনন্দন নয়, আদর্শের বীজ বপন করা এবং মনস্তাত্বিকভাবে সে আদর্শকে ধারণ করা আসল কাজ। যেকোন অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে তারুণ্যের শক্তি বারবার জেগে উঠে এবং সৃষ্টি হয় নতুন ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু আমাদের সেই আলোর দিশারী।

অপু ভট্টাচার্য্য
সহ-সম্পাদক
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ
[email protected]

বার্তাজগৎ২৪/ এমএ