বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কৃতিত্ব তার নেতৃত্বের

বার্তাজগৎ২৪/ এমএ
বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক: বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক:
প্রকাশিত: ৬:৫০ অপরাহ্ন, ০৪ অগাস্ট ২০২২ | আপডেট: ৭:৫৭ অপরাহ্ন, ১১ অগাস্ট ২০২২
ফাইল ছবি

বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, যার কৃতিত্ব তার নেতৃত্বকে দেওয়া যেতে পারে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু উদ্বোধন করে এটাকে ‘গর্ব ও সামর্থ্যের প্রতীক’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ১৯৯২ সালের প্রথম দিকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক নীতি এবং পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে অর্থনৈতিক নীতির ভারসাম্য আনয়নের ঝুঁকি গ্রহণ করেছিলেন। শেখ হাসিনা তাঁর বাবার সমাজতান্ত্রিক এজেন্ডা থেকে বাজারভিত্তিক পুঁজিবাদী প্রবৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করেন। তিনি অন্যান্য এশীয় দেশগুলির কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন যাদের অর্থনৈতিক সাফল্য চারটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক উন্নয়ন, রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বাণিজ্য উদারীকরণ এবং রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ। একটি সম্মেলনের সময় একজন অর্থনীতিবিদ যখন বাণিজ্য উদারীকরণের সুবিধা সম্পর্কে বোঝাতে চান তখন শেখ হাসিনা বলেন, “আপনার আমাকে বাণিজ্য উদারীকরণের বিষয়ে বোঝাতে হবে না। যখন যুগোস্লাভিয়ান সীমান্তে ইতালীয় শহর ট্রিয়েস্টে পদার্থবিদ স্বামীর সঙ্গে আমি থাকতাম, তখন দেখেছিলাম সীমান্ত সপ্তাহে তিনবার খোলা হচ্ছে এবং দু'পাশ থেকে লোকজন যাতায়াত করছে, পণ্য ক্রয় করছে এবং ফিরে যাচ্ছে।" এটি প্রমাণ করে যে শেখ হাসিনা অন্যান্য বিবেচনার পরিবর্তে অর্থনীতিতে আন্তরিকভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন, যার প্রতি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আকৃষ্ট হয় ।

যদিও ১৯৭১ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে, বাংলাদেশ জবাবদিহিমূলক প্রচারণা এবং সামরিক শাসন বরদাস্ত করে। ২০০৯ সাল থেকে সেনাবাহিনী পিছনের আসন নিয়েছে। বাংলাদেশ বেসামরিক গণতান্ত্রিক সরকার লাইনচুত্য হয়নি বললেই চলে এবং বৈধতা নিয়ে সরকারগুলোকে কিছুটা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। যদিও এর গণতান্ত্রিক ইতিহাস অপ্রকাশিত নয়, বাংলাদেশের সরকার অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিষয়ে জনসাধারণের সমালোচনা এড়িয়ে গেছে। শাসন ব্যবস্থায় স্বল্প অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী দূরদর্শী তীক্ষ্ণতা এবং দৃঢ় প্রত্যয় ধারণ করে যে, অর্থনৈতিক অগ্রগতিই দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের একমাত্র উপায়।

বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও পনের বছরেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত প্রবৃদ্ধি, বাংলাদেশ বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির একটিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৭০ সালে দেশটি পাকিস্তানের তুলনায় ৭৫% বেশি দরিদ্র ছিল কিন্তু এখন এটি ৪৫% বেশি ধনী। ১৯৭০ সালে ১ কোটির বেশি মানুষ অভুক্ত ছিল কিন্তু এখন দেশটির জনসংখ্যা ১৭০ মিলিয়ন যেখানে পাকিস্তানের জনসংখ্যা ২৩০ মিলিয়ন। ২০২১ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৪৭ বিলিয়ন ডলার এবং পাকিস্তানের রপ্তানি ছিল ২৮ বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তানের ১৫৪৩ ডলারের তুলনায় বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ২২২৭ ডলার। ২০২২ সালে পাকিস্তানের ৩৪৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় এর মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৪১১ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার পাকিস্তানের ১২-১৫%  এর তুলনায় ৬%।  এখন পাকিস্তানের মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১% এবং আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়াও পাকিস্তানি রুপির তুলনায় বাংলাদেশি টাকা অনেক শক্তিশালী। গুরুত্বপূর্ণভাবে, অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণসহ বাংলাদেশের সাক্ষরতার হার উর্ধ্বমুখী। পাকিস্তানে রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তিগত লাভের জন্য আগ্রহী। বারবার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারসাজি একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং অপরিবারতান্ত্রিক দলগুলোর বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এটা স্বীকার করতে হবে যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, শক্তিশালী বেসামরিক প্রতিষ্ঠান এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। পাকিস্তান উত্তরাধিকারসূত্রে দুর্বল বুর্জোয়া গোষ্ঠী নিয়ে একটি ‘ওভারডেভেলপড স্টেট’, যা একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে প্যাট্রোন-ক্লায়েন্ট সম্পর্কে যুক্ত ছিল। দেশটি অনিবার্যভাবে বিশেষাধিকার এবং পৃষ্ঠপোষকতা দ্বারা চিহ্নিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। কৃষি এবং ব্যবসায়িক আয় প্রাথমিকভাবে করের নেট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেখানে উৎপাদনশীল সম্পদ করের অনুপস্থিতি রয়েছে; বিশাল শিল্প ও এস্টেট কমপ্লেক্সগুলি যে কোনও প্রকার শুল্ক থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত। আমাদের সংসদে জমিদারদের আধিপত্য রয়েছে, এটি একটি ছোট আশ্চর্যের বিষয় যে, প্রাদেশিক এলাকায় কৃষি আয়কর একটি অসঙ্গত বিষয় হিসাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ফলস্বরূপ, কৃষি ও শিল্প খাতে কর আরোপিত হলেও করের আওতা ছোট থেকে যায়।

১৯৫৮ সাল থেকে সরকার নিয়ে সকল ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা জনগণের ক্ষমতায়নের পরিবর্তে সামন্ত শক্তিকে বৃদ্ধি করেছে। পাকিস্তানে উন্নয়নের অনুসৃত পথ সুবিধাভোগী, ধনী এবং অভিজাতদের পক্ষে গিয়েছে; যাদের এখন রাষ্ট্রের প্রতি অবদান রাখা আবশ্যক।

বাংলাদেশের উদাহরণ অনুসরণ করে, পাকিস্তানি নেতৃত্বকে অবশ্যই জাতীয় এজেন্ডা হিসাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনুসরণ করতে হবে এবং আঞ্চলিক শান্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আপসহীন কার্যকর প্রতিরক্ষা, পর্যাপ্ত সম্পদ ছাড়তে হবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য। এগুলো বিবেচনায় নিয়ে আঞ্চলিক পন্থায় প্রবৃদ্ধির জন্য বাণিজ্য উদারীকরণে ভারত, ইরান, চীন, আফগানিস্তান এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্য করতে হবে। এছাড়াও, রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধি মডেল উচ্চ-মূল্য-সংযোজিত পণ্যের উপর পুনরায় ফোকাস করবে। পাকিস্তান সস্তা শ্রমের তুলনামূলক সুবিধা ভোগ করে;  দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে যা রূপান্তর করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে নারীদের জন্য শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণকে ব্যাপকভাবে বাড়াতে ও গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগের জন্য একটি নিরাপদ এবং আইনানুগ অনুকূল পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি আয়ের উপর একটি ন্যায্য কর আরোপের গুরুতর প্রচেষ্টা প্রয়োজন এবং ধনী শিল্প কার্টেলগুলিকে অবশ্যই জাতীয় সম্পদে অবদান রাখার মতো করে প্রস্তুত করতে হবে। সম্পদ ও মৃত্যু কর ব্যতীত বৃহৎ কর্পোরেট ও এস্টেট খাতগুলোকে করের আওতায় আনতে হবে।

পাকিস্তানের নেতৃত্ব বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে, কিন্তু প্রধান পদক্ষেপটি হওয়া উচিত যে শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, যা প্রতিরক্ষা এবং গণতন্ত্র উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
(অনূদিত)
মূল লেখক: শাহিবজাদা রিয়াজ নূর

বার্তাজগৎ২৪/ এমএ