আগস্ট হচ্ছে বাঙালির আজন্ম বিষাদ কাব্য

বার্তাজগৎ২৪/ এমএ
বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক : বার্তাজগৎ২৪ ডেস্ক :
প্রকাশিত: ৭:৩৭ অপরাহ্ন, ২৭ অগাস্ট ২০২২ | আপডেট: ৭:৩৭ অপরাহ্ন, ২৭ অগাস্ট ২০২২

আগস্ট মানেই বাঙ্গালির এক বিষাদ সিন্ধুর নাম আগস্ট মানেই এক সুমদ্র বেদনার উপাখ্যান। আগস্ট যখন আসে এই ধরণীর বুকে, প্রকৃতি শ্রাবণের ধারার ন্যায় কান্নায় ভেজ্ঞে পড়ে বাংলার বুকে।

প্রকৃতিতে ভূমিকম্প হলে হ্ঠাৎ যেমন পৃথিবী ও সৃষ্টি জগৎ কেপে ওঠে এক আচমকা ঝাঁকুনিতে, তেমনি জাতির পিতার মৃত্যুতে বাংলাদেশ সহ সমগ্র বিশ্ব এক গভীর দু:খে কেপে উঠেছিল ঐ দিন। তারই অনুভব দুঃস্বপ্নের মত আজও হানা দেয় বাঙ্গালির শোকাতর হৃদয়ে আর আগস্টই হচ্ছে সেই চলমান ভূমিকম্পের নাম।

আগস্ট মাস এলেই মনে পড়ে যায় সেই ভয়াবহ স্মৃতি, যা আমাদের বেদনার্ত করে তোলে। যে বিশাল হৃদয়ের মানুষকে কারাগারে বন্দি রেখেও স্পর্শ করার সাহস দেখাতে পারেনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, অথচ স্বাধীন বাংলার মাটিতেই তাকে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার সেই ষড়যন্ত্রের নীলনকশা আজও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। জাতির পিতাকে হারানোর সেই দুঃসহ স্মৃতি দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে সমগ্র বাঙ্গালি জাতি। আজও বেদনার আকুতিতে রাতের আধারে ঘুম ভেংগে যায়।

তাইতো ঘুম থেকে জেগে উঠে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে ও একাগ্র চিত্তে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে যে,"যদি রাত পোহালেই শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই" আহ! যদি শোনা যেত"।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক দল রক্তপিপাসু, স্বাধীনতা বিরোধী দালাল চক্র, ঐ দিন শুধুমাত্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকেই হত্যা করেনি, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেদিন আরও প্রাণ হারান তার সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, সেনা কর্মকর্তা শেখ জামাল ও ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেল এবং নবপরিণীতা দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল। তবে প্রবাসে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

বৃষ্টিঝরা শ্রাবণের অন্তিম দিনে সেদিন বৃষ্টি নয়, ঝরেছিল রক্ত। বাংলার ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের মতো বিশাল তাঁর বুক থেকে রক্তগোলাপের মতো লাল রক্ত ঝরেছিল ঘাতকের বুলেটে। সেদিন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাসগৃহে, বত্রিশ নম্বরের সেই বাড়িতে, আমাদের ইতিহাস তীর্থে, হত্যা করা হয়েছিল কেবল তাঁর নশ্বর শরীরকে, কিন্তু তাঁর অবিনশ্বর চেতনা ও আদর্শ ছিল মৃত্যুঞ্জয়ী। ঘাতকের সাধ্য ছিল না ইতিহাসের সেই মহানায়কের অস্তিত্বকে বিনাশ করে।

বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ যমজ শব্দ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তারা বাংলাদেশকেই হত্যা করতে চেয়েছিল, মুছে দিতে চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধজাত এই দেশটিকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে। কিন্তু এত সহজেই কি মোছা যায় জনকের নাম আর জনকের স্বপ্নজাত দেশটিকে? দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসে এই আমরাই তো একমাত্র জাতি যারা সশস্ত্র সংগ্রাম করে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছি একটি মানুষের ডাকে, একটিমাত্র রণমন্ত্র কণ্ঠে ধারণ করে। সেই মানুষটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর সেই রণমন্ত্র ‘জয় বাংলা’। কার সাধ্য এ জাতির গতিরোধ করে, যখন এ জাতির উদ্গাতা বঙ্গবন্ধুর মতো হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির এক সন্তান আর যখন তাঁর বাহুতে আজও বঙ্গবন্ধুরই শক্তি রয়েছে বহমান।

দ্য টাইমস অব লন্ডনের ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লেখ করা হয় ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সব সময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই। একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।’

কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও কিংবদন্তি বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছিলেন, 'আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় তিনি হিমালয়ের মতো।'

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম সেই পুরুষ তিনি, একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। বাংলার মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে (১৯২০-১৯৭৫) স্বদেশের মাটি আর মানুষকে এমন গভীর ভালবাসার বন্ধনে বেঁধেছিলেন, যে বন্ধন কোনদিন ছিন্ন হবার নয়। আজীবন ঔপনিবেশিক শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে, দরিদ্র, নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে এমন এক অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন, যার তুলনা বিরল। একজন প্রকৃত নেতার যেসব গুণাবলী থাকা প্রয়োজন তার সব নিয়েই জন্মেছিলেন ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষ। যাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল বহুবর্ণিল, যাঁর কণ্ঠে ছিল জাদু। যিনি রচনা করেছিলেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিজয় ইতিহাস।

কী ঘটেছিল সেই সর্বনাশা কালো দিনে॥ ‘কী বীভৎসতা! রক্ত, মগজ ও হাড়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল প্রতিটি তলার দেয়াল, জানালার কাঁচ, মেঝে ও ছাদে। রীতিমত রক্তগঙ্গা বইছে যেন ওই বাড়িতে। গুলির আঘাতে দেয়ালগুলোও ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। চারপাশে রক্তের সাগরের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ঘরের জিনিসপত্র। প্রথম তলার সিঁড়ির মাঝখানে নিথর পড়ে আছেন ঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া চেক লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি পরা স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু লাশ। তলপেট ও বুক ছিল বুলেটে ঝাঁঝরা। নিথর দেহের পাশেই তাঁর ভাঙ্গা চশমা ও অতিপ্রিয় তামাকের পাইপটি। অভ্যর্থনা কক্ষে শেখ কামাল, টেলিফোন অপারেটর, মূল বেডরুমের সামনে বেগম মুজিব, বেডরুমে সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজী জামাল, নিচতলার সিঁড়িসংলগ্ন বাথরুমে শেখ নাসের এবং মূল বেডরুমে দুই ভাবির ঠিক মাঝখানে বুলেটে ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলের লাশ।

রাজনৈতিক হত্যা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংঘটিত হয়েছে বিভিন্ন কাল পরিসরে। প্রতিটি হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে? এখানে ইতিহাস যেন উল্টো পথযাত্রী! বিশ্বের ইতিহাসে একসঙ্গে এত নৃশংস রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের নজির নেই বললেই চলে। তবুও কী আশ্চর্য, এই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আত্মস্বীকৃত খুনীদের চূড়ান্ত শাস্তি পেতে কেটে যায় একে একে ৩৪ বছর। জাতি দেখেছে এই দীর্ঘ সময়ে নিষ্ঠুর এই ঘাতকদের প্রকাশ্যে পুরস্কৃত করার ঘৃণ্য চিত্র।

সেই বাধার প্রাচীর ডিঙিয়ে অবশেষে বিচারের বাণীর নিভৃত কান্নার অবসান ঘটে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি মধ্যরাতের পর। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির রায় কার্যকর হয় পাঁচ আত্মস্বীকৃত খুনীর। কলঙ্কমুক্তির আনন্দে উদ্বেল হয় গোটা দেশ। তবুও জাতির খুনীদের প্রতি ঘৃণা এতটুকুও কমেনি। অনেকেরই জিজ্ঞাসা- ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর হলেও এসব ঘৃণ্য নরপশুর প্রতি বাঙালীর ঘৃণা-ধিক্কার এতটুকুও কমবে না। বরং দেশ যতদিন থাকবে, ততদিন এসব ঘাতকের কবরে প্রজন্মের পর প্রজন্মের সন্তানরা তাদের হৃদয়ের ঘৃণা জানাতে এতটুকুও ভুলবে না।

পরবর্তীকালে ঐ অপশক্তি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনার উপর বারবার প্রাণনাশের চেষ্টা করেছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট এই শোকের মাসেই গ্রেনেড হামলায় হত্যার চেষ্টা করা হয় জাতির জনকের কন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। ভাগ্যক্রমে সেদিন তিনি বেঁচে গেলেও এ ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী, আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।

৭৫ এর ১৫ আগস্টে রাহু নামক এক অপদেবতা সূর্য নামক বঙ্গবন্ধু ওরুফে বাংলাদেশকে কিছু সময়ের জন্য গ্রাস করেছিলো মাত্র কিন্তু তা ছিল সাময়িক কারণ বঙ্গবন্ধুর প্রবাহিত সূর্যের প্রবাহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই রাহুর গ্রাস থেকে সূর্য নামক বাংলাদেশকে মুক্ত করে বিশ্বের দরবারে এক মাইল ফলক স্থাপন করেছেন ।

তাইতো চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে হে পিতা আপনি একবার এসে দেখে যান আপনার সুযোগ্য কন্যা আপনার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে দিনরাত জনমানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমৃদ্ধ হাতে ভালো থাকুক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। তাই কবির ভাষার হৃদয় বলে উঠে—
“যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।”

কাজী বনফুল
লেখক ও কলামিস্ট 

বার্তাজগৎ২৪/ এমএ